Homeসমসাময়িক গল্প

শেষ প্রাপ্তি (পর্ব- ১)

শেষ প্রাপ্তি (পর্ব- ১)
Like Tweet Pin it Share Share Email

গ্লোজি রেড ঠোঁটজোড়া তার দিকেই এগিয়ে আসছে। না না , ঠেকাতে হবে। না হয় এক্ষুনি বন্ধি করে নেবে তার ঠোঁট দুটো কে। ধাক্কা দিয়ে মানবীটাকে সরিয়ে দিলো তার উপর থেকে। তারপর ওঠে দাঁড়ালো নাদিফ।
মানবীটা ছিল জিয়ানা। কোত্থেকে যেন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। এরপর সে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যায় মাটিতে। ঘাসের উপর। যেখানে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল জিয়ানার জন্যে।

: এই! এভাবে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে দিলে কেন? তুমি কি জানো আজকের দিনটা আমাদের জন্যে কতটা স্পেশাল?
: হুম, জানি।
: তো, সেলিব্রেট করব না?
: হ্যাঁ করব। তবে এখন নয়।
: কখন ?
: বিয়ের পর।
: কীহ্!
: হ্যাঁ জিয়ানা। আজকে তোমাকে কিছু কথা বলার জন্য ডেকেছি। মনোযোগ দিয়ে শুনো।
: হ্যাঁ, বল। মনভার করে বলল জিয়ানা।

: একমাস আমাদের মাঝে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে। এরপর আমরা বিয়ে করে ফেলব।
নাদিফের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়ল জিয়ানা।

: তুমি যা বলছো বুঝে বলছো তো? তুমি ভালো করেই জানো তোমার সাথে কথা না বলে আমি একমিনিটও থাকতে পারব না।
: হ্যাঁ জানি। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
: কেন?
: কারণ আমরা একটা হারাম রিলেশনে জড়িয়ে আছি। আমি আল্লাহ কে আর অসন্তুষ্ট করতে চাই না। আমি দ্বীনের পথে চলতে চাই। এখন থেকে আমি আল্লাহর প্রতিটা হুকুম মেনে চলতে চাই।
: কিন্তু আমার লেখাপড়া শেষ হতে আরও ২-৩বছর বাকি। এই মুহূর্তে আব্বু আম্মু কখনোই আমাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে না। আর আমিও এখনো বিয়ের জন্য প্রিপেয়ারড্ নই। সেটা তুমি ভালো করেই জানো। প্রচন্ড বিরক্তি জিয়ানার চোখেমুখে।
: জিয়ানা, আমার একটা জবের অফার এসেছে । জবটা হয়ে গেলেই আমরা বিয়ে করে ফেলব। এভাবে আর কত…
দিন দিন আমাদের গুনাহের বোঝা শুধু ভারিই হচ্ছে ।
: কিন্তু…
: জিয়ানা, সত্যিই কি তুমি আমাকে চাও?
: হ্যাঁ অবশ্যই চাই।
: তাহলে আর কোন কিন্তু নয়।
: নাদিফ!
: আমি যেটা বলেছি সেটাই হবে।
কথাটা বলে আর এক মূহুর্তও দাঁড়ালো না নাদিফ। কারণ জিয়ানার চোখের দিকে তাকালে সে নিমিষেই গলে যেতে বাধ্য। সে জানে এ মুহূর্তে জিয়ানার চোখদুটো ছলছল করছে অশ্রুতে।

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

নাদিফ সারোয়ার। মা আর ছোট বোনটাকে নিয়ে তার পরিবার। বাবা বেঁচে আছে কিনা জানে না সে। তার ছোটকালে বাবা ব্যাবসার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিল বিদেশে। দেশে এত অঢেল সম্পত্তি রেখে কেন সে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না।
সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে জীবনের প্রায় বাইশটি বছর একাকী কাটিয়ে দিয়েছেন মিসেস সারোয়ার।
স্বামীর অজস্র টাকা ব্যাংকে পড়ে থাকলেও তিনি চান ছেলে ভালো একটা চাকরি করুক। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াক।
লাভ- লোকসানের ভয়ে ছেলেকে ব্যাবসায় হাত দিতে দেন না তিনি।
খুব উসৃঙ্খল না হলেও ধর্মীয় মাইন্ডের কোন কালেই ছিল না নাদিফ। কিন্তু আজ দুমাস হলো তাদের এলাকার মসজিদে নতুন ইমাম এসেছেন। তার তিলাওয়াত আর ইসলাহি নাসীহাহ্ গুলো নাদিফের মন ছুঁয়ে যায়।
গত সপ্তাহে জুমার খুতবায় বিয়ের পূর্বেকার হারাম রিলেশন সম্পর্কে বয়ান করেছিলেন।
সেই থেকে নাদিফ কঠোরভাবে প্রতিজ্ঞা করেছিল – হয়তো বিয়ে করে জিয়ানাকে রাখবে নয়তো ছাড়বে। বিয়েতে রাজি না হলে এছাড়া আর কোন উপায় নেই।
জিয়ানাকে ছেড়ে থাকাটা তার জন্যে কতটা কঠিন হবে, সেটা সে ভালো করেই জানে। তবুও তাকে থাকতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।

মেলোডি সুরে বেজে উঠল মোবাইলটা। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা পুরুষালী কন্ঠ-
: হ্যালো, জিয়ানা বলছো,‌ রাইট?
: হ্যাঁ, রাইট। কিন্তু আপনি কে?
ওপাশ থেকে শোনা গেল এক দীর্ঘশ্বাস।
: হ্যাঁ, চিনবা না তো জানি।
: প্লীজ , ভণিতা না করে বলে ফেলুন, কে আপনি?
: আমি তপন। এবার হয়তো চিনতে পেরেছ।
: হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। কোন প্রয়োজন আছে নাকি?
: কেন, প্রয়োজন ছাড়া কি আমরা কথা বলতে পারি না? একা একা নিশ্চয়ই বোর ফিল করছো?
: একা একা মানে?
: আরে আমার কাছে কিছু লুকাতে যেও না, প্লীজ। আমি সব জানি।
: কী জানেন আপনি?
: তোমাদের ব্রেকাপ। ব্রেকাপ হয়ে গেছে তোমার নাদিফের সাথে।
: প্লীজ, উল্টা পাল্টা বকবেন না। শুধু কয়েক দিন মাত্র যোগাযোগ বন্ধ থাকবে, এ’ই যা! ঝাঁঝের সাথে বলল জিয়ানা।
: এই তো একই। এভাবেই তো ব্রেকাপ হয়। আচ্ছা যাও, বাদ দাও এগুলো। মানুষের কথা বলে লাভ নেই। আমরা এখন নিজেদের কথা বলি, কেমন?
: নিজেদের কথা মানে?!
: জিয়ানা, তুমি ভালো করেই জানো ঠিক কবে থেকে তোমাকে আমি লাইক করি।
: হুম জানি। আর আমার জানা মতে মোটামুটি সবাই আমাকে লাইক করে।
কারণ , আনলাইক করার মত কোন কিছু এখনো করি নি।
: আহ্হা, বাদ দাও তো ওসব। সুন্দর সময়টা শুধুই তর্কাতর্কি করে নষ্ট করো না প্লীজ। এখন তুমি কোথায় বলো । দেখতে ইচ্ছে করছে তো।
: বাসায় ।
: গ্রেট! তবে বারান্দায় এসো।
তপনের কথায় কৌতুহল বশতঃ বারান্দায় উঁকি দিল জিয়ানা।
রাস্তায় বাইকে বসে থাকা তপনকে দেখে টাস্কি খেলো সে। আর ওর চমকে যাওয়া চেহারা দেখে ফিক করে হেসে দিল তপন।
সাঁই করে রুমে ঢুকে গেল জিয়ানা। বুকটা ঢিপঢিপ করছে।
কালো চশমায় তপনকে পুরো হিরোর মত লাগছে।
আর নাদিফ! সে তো বরাবরই আনস্মার্ট, বেকডেটেট!
বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকায় জিয়ানা।

আর তখন রাস্তায় বসে তপন ভাবছে- শিকারী টোপ গিললো তাহলে! কারণ অসংখ্য মেয়েকে ছ্যাকামাইসিন খাওয়ানো তপন মেয়েদের চেহারা দেখলেই বোঝে যায়- তার বুকের ভিতর এখন কী চলছে।
ভার্সিটিতে তার নাম প্লেবয় তো আর এমনি এমনিই ছিল না!!!

°°°°°°°′°°°°°°°°°°°°°°°°°

হ্যাঁ, নাদিফ বরাবরই বেকডেটেড, আনরোমান্টিক। তবে আনস্মার্ট বললে ভুল হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আর গোছানো স্বভাবের সে । ওভার স্মার্টনেস দেখাত না এ’ই যা।
স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকত সবখানেই। আর অন্যান্য বয়ফ্রেন্ডদের থেকে সে ছিল আলাদা। বেবী, জানু, খেয়েছো? , তুমি না খেলে আমিও খাব না, তুমি না ঘুমালে আমিও ঘুমাবো না, এ ধরনের ন্যাকামো টাইপের কথাবার্তা একদমি অপছন্দ তার। এক্ষেত্রে আনরোমান্টিকই বলা চলে!

আর তাদের দেখাটাও হয়েছিল একটা দূর্ঘটনা বশতঃ।
একটা গ্রোসারি শপে এসেছিল নাদিফ। সে তখনো শপে ঢুকেনি। একটা বাস রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছিল। ছাউনীতে বসে থাকা মেয়েটা বাসে উঠতে যাবে ঠিক তখনই ছুটন্ত এক ট্রাক এসে সংঘর্ষ বাঁধায় বাসের সাথে। আর বাসের ধাক্কায় মেয়েটি ছিটকে পড়ে এক হাত দূরে। চোখের সামনে রক্তাক্ত শরীরে মেয়েটাকে ছটফট করতে দেখে ছুটে আসে নাদিফ। পাঁজাকোলা করে তাকে নিয়ে যায় পাশের এক প্রাইভেট হসপিটালে।
প্রচুর রক্তক্ষরনে জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটি।
আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাকে ছাড়ছে না।
কী করবে ভাবছে নাদিফ। হঠাৎ মনে হল- মেয়েটার ব্যাগে নিশ্চয়ই তার ফোন আছে।
ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল পেল ঠিকই। কিন্তু পাসওয়ার্ড তো তাকে জানতে হবে!!
উফ্ শীট! প্রচন্ড বিরক্তি লাগছে তার। এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে!!
বিরক্তি নিয়ে হাত পা বেন্ডেজ করা মেয়েটার দিকে তাকালো সে। না, ওর চেয়ে বেশি ফর্সা না মেয়েটা। কিন্তু চেহারাতে এত মায়া কেন? চোখ ফেরানো দায়।
কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থাকলো কে জানে। ধেন
ভাঙলো মেয়েটির গোঙানির শব্দে।
জ্ঞান ফিরেছে মেয়েটার। কাছে গিয়ে বসলো সে ।
ওর দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো মেয়েটা।
ভয়ে, লজ্জায় , নাকি অস্বস্থিতে বুঝতে পারছে না সে।
মেয়েদের চোখের ভাষা বুঝতে পারে না নাদিফ। কী করে বুঝবে, সে তো কখনো প্রেম করে নি😅

সেদিন রাত ১১টায় বাসায় ফিরেছিল নাদিফ।
মেয়েটির গার্ডিয়ান শেষ পর্যন্ত খোঁজ পেয়ে এলেও তার ঘাড়েই সব বোঝা বইতে হয়েছিলো। কারণ মেয়েটার মা এসেছিল একা। বাবা প্রবাসী।
তিনি এসেই ডাকতে শুরু করলেন- জিয়ানা, মা আমার। কেমন আছিস মা? কিভাবে এমন হল তোর? কান্নায় গলা ধরে এলো তার।
: আন্টি প্লীজ এভাবে কাঁদবেন না। বিপদ আপদ সব আল্লাহর ইচ্ছা। তাকে শান্তনা দেয়ার চেষ্টা করল নাদিফ।
: বাবা , তোমার কাছে আমি ঋণী। তোমার উসিলায় আল্লাহ আমাকে অনেক বড় উপকার করেছেন। না হয় আজ…
দুচোখ বেয়ে প্রবল ধারায় অশ্রু নামছে তার।
: আন্টি অত অস্তির হবেন না। দেখুন, আমাদের শক্ত হতে হবে। না হয় জিয়ানা আরো বেশি ভেঙ্গে পরবে।
শেষের কথাগুলো বলে নিজেই থতমত খেয়ে গেল। ‘আমাদের’ মানে!!! এই কয়েকঘণ্টায় সে নিজেকে ওদেরই একজন ভাবা শুরু করে দিয়েছে!! বাহ্ , ভালোই তো!!
: বাবা, আমি একা মানুষ! ওর বাবা প্রবাসী। এই একটাই সন্তান আমাদের। ওর কিছু হলে…
: আহ্ আন্টি! আমি আছি তো। আপনি একা নন। জিয়ানা
যতদিন হসপিটালে থাকবে ততদিন আমি আপনার পাশে থেকে আপনাকে হেল্প করব।
: ধন্যবাদ বাবা। আর তোমার নামটা তো জানা হল না।
: অহ্, আমি নাদিফ। নাদিফ সারোয়ার।
আন্টি আমার নাম্বারটা রাখুন। প্রয়োজন হলে অবশ্যই কল করবেন।

ততক্ষণে পুরোপুরি হুশে এসে গেছে জিয়ানা । দুজনের চোখাচোখিও হয়েছে কয়েকবার। জিয়ানার নজরে যে পুরোপুরি ঘায়েল হয়ে গেছে , সেটা সে ভালো করেই বুঝতে পারছে।

এরপর দিন থেকে প্রতিদিন সকালের নাস্তার পরে ওর গন্তব্য সেই প্রাইভেট হসপিটাল

চলবে…

লেখিকা – ফিরদাউসি মাহমুদ

Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Need Help? Chat with us