Main Menu

রোহিঙ্গা নিধনের আগাম তথ্য চেপে যায় জাতিসংঘ!

জাতিসংঘেরই অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নৃশংসতা চালানোর বিষয়ে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। ‘ম্যাটার অব আরজেন্সি’ বা জরুরি বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে ‘পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির’ পূর্বাভাস দিয়ে ‘ঐকান্তিক জরুরি পরিকল্পনা’ গ্রহণ এবং তা জাতিসংঘের সব সাহায্য সংস্থাকে অবহিত করার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ‘রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের ভূমিকা’ শীর্ষক নিজেদের এ প্রতিবেদনটি অগ্রাহ্য ও গোপন করে রাখে বিশ্বসংস্থাটি।

এসবের পেছনের নাটের গুরু হলেন মিয়ানমারে জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী রেনাটা লক-ডেসালিয়েন, যিনি একসময় বাংলাদেশেও জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক ছিলেন। এর রকম বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস যুক্ত করায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি প্রতিবেদনটি গোপন রাখেন। এমনকি প্রতিবেদনের ওপর মিয়ানমারে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর একটি ‘ফিডব্যাক মিটিং’ করতেও বাধা দেন রেনাটা।

বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। গার্ডিয়ান দাবি করেছে, জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে ২৮ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনের একটি কপি তারা সংগ্রহ করেছে। গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটির লেখক রিচার্ড হোরসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও স্বীকার করেছেন, বিষয়টি অবশ্যই জাতিসংঘ জানত। প্রসঙ্গত, গত সপ্তাহে বিবিসির একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, রেনাটা ডেসালিয়েনে মিয়ানমারে জাতিসংঘ অফিসে রোহিঙ্গা বিষয়ে কথা বলতে দিতেন না। তিনি রাখাইন অঞ্চলে জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের সফরে যেতে বাধা প্রদানসহ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো কর্মকর্তা সোচ্চার হলেই তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন।

‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস : ইউএন সাপ্রেজড রিপোর্ট প্রেডিক্টিং ইটস শর্টকামিংস ইন মিয়ানমার’ শীর্ষক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনটির ভূমিকায় বলা হয়, ‘বিশ্বসংস্থাটির অভ্যন্তরীণ সূত্র মতে, রাখাইনে মারাত্মক সংকটের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে জাতিসংঘের কৌশল পর্যালোচনা ও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল প্রতিবেদনটিতে। আর জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের অনুমোদনেই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছিল। ’ প্রতিবেদনে ছয় মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল।

জাতিসংঘ সূত্রগুলো গার্ডিয়ানকে বলেছে, ‘জাতিসংঘের অনুমোদনেই (রোহিঙ্গাবিষয়ক) প্রতিবেদন তৈরি করা হলো। অতঃপর তা গোপন করা হলো। প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমারে জাতিসংঘের কৌশল নিয়ে সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়, আসন্ন রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘ অপ্রস্তুত। ’

‘জাতিসংঘের নিয়োগ করা একজন পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) এই পর্যালোচনামূলক প্রতিবেদনটি তৈরি করেন এবং গত মে মাসে তা জমা দেন। এতে মিয়ানমারে জাতিসংঘের কার্যক্রমকে অত্যন্ত জটিলভাবে বিশ্লেষণের  সঙ্গে উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, ‘মানবাধিকারের বিষয়ে নীরব থাকা উচিত হবে না। ’ নিরপেক্ষ বিশ্লেষক রিচার্ড হোরসে প্রতিবেদনটি তৈরি করেন।

রিচার্ড হোরসের প্রতিবেদনটিতে ‘ম্যাটার অব আরজেন্সি’ উল্লেখ করে এ বলে সুপারিশ করা হয় যে এই ইস্যুতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরকে অগ্রগতির উপায় চিহ্নিত ও শক্তিশালী করতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে ‘কঠোর ও নির্বিচারী’ হবে। তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবেও ফলে যায়, যখন ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা কয়েক ডজন চৌকিতে হামলা চালায়। এরপরই মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী সামরিক অভিযান তীব্র করে তোলে। এর পর থেকে এক মাসেরও কম সময়ে অন্তত পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশটিতে পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী ক্যাম্প বানানো হচ্ছে।

‘রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের ভূমিকা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি মূলত মিয়ানমারে জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়ক রেনাটা লক-ডেসালিয়েনের অনুমোদনে তৈরি করা হয়। এতে ১৬টি সুপারিশ করা হয়। হোরসে তাঁর প্রতিবেদনে রাখাইনে আরো কর্মকর্তা নিয়োগ এবং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি আলাপের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তিনি তাঁর প্রতিবেদনটি সব সাহায্য সংস্থার মধ্যে বিতরণের কথা বলেন।

জাতিসংঘ ও এর মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোর ভেতরের সূত্রগুলো গার্ডিয়ানকে জানায়, এই সুপারিশগুলো অগ্রাহ্য ও গোপন করা হয়েছে। এ বিষয়ে একান্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পেপারটি (প্রতিবেদন) অকেজো করে ফেলা হয় এবং তা জাতিসংঘ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে বিলি করা হয়নি। কারণ, রেনাটা ডক-ডেসালিয়েন এই বিশ্লেষণ পছন্দ করেননি। আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘এটি (প্রতিবেদন) রেনাটার হাতে দেওয়া হয় এবং তিনি তা কারো কাছে বিলি করেননি। কারণ তিনি এটাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। ’

২৮ পৃষ্ঠার ওই ডুকুমেন্টে লেখক একই সঙ্গে এ বিষয়ে একটি ‘ফিডব্যাক মিটিং’ প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছিলেন। সভাটি মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকদের নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গার্ডিয়ান জানতে পেরেছে, সভাটি কখনোই হয়নি।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র। তিনি দাবি করেন, ‘মিয়ানমারে জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়ক মানবাধিকার নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ যা করবে, সব কাজের মূলেই থাকবে মানবাধিকার। ’

এ ব্যাপারে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন লেখক রিচার্ড হোরসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ই-মেইলে সাড়া দিয়ে বলেন, ‘জাতিসংঘ (সতর্কবাণীর বিষয়টি) জানত। অথবা রাখাইন রাজ্যের স্থিতাবস্থা যে একটি মারাত্মক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা তাদের জানা থাকারই কথা। ’ তিনি বলেন, এটি হতে পারে যে আবাসিক সমন্বয়কারী হয়তো ভিন্ন কিছু অথবা আরো ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জাতিসংঘের যেকোনো ব্যর্থতার প্রাথমিক দায়টা তাদেরই থাকে। ’ তিনি বলেন, ‘তারা (জাতিসংঘ) মিয়ানমারে সমন্বিতভাবে কাজ করেনি এবং তাদের সুসমন্বিত কোনো ব্যবস্থাও ছিল না। ’

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, এটা জাতিসংঘের ‘মানবাধিকার সর্বাগ্রে’ রাখার কাজ ছিল না। এটি মানবাধিকারকে পেছনে ঠেলে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘকে স্বীকার করতে হবে যে তাদের উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতাও পরিস্থিতির এত দ্রুত অবনতি ঘটাতে সাহায্য করেছে। ’

Comments

comments






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress