Main Menu

বিদেশি গল্প : আমি নই,এসব পোষাকেরই প্রাপ্য    আবু লাবিব মুহাম্মদ ইউনুস

আলি আনমনা হয়ে চারদিকে তাকাল। মনটা ভীষণ ভারী। কাঁদো কাঁদো। এবার সোজা রওয়ানা হলো বাড়িতে। দ্রুত। তড়িৎ পদক্ষেপ। মনের ভেতর নানান জল্পনা। ক্রোধ মেশানো। না, এটা ঠিক নয়। মানুষে মানুষে এমন বিবেধের দেয়াল নির্মাণ অন্যায়।

মেহমান হিসেবে সবাই সমান সম্মানের অধিকার রাখে। ধনী-নির্ধন, উঁচু নীচুর এমন নিষ্ঠুর প্রাচির… ! না, কাজটা ওরা ভীষণ খারাপ করেছে।

শারাফত সাহেব। এলাকার মান্য ও গুনিব্যাক্তি। শ্রদ্ধেয়জন । রাশভারী প্রকৃতির। বিত্ত্ববান। সম্মান সম্পদে পুরো এলাকায় সেরা। তার ছোট ছেলের অলিমা। বিশাল আয়োজন। বিত্তবান । বিত্তহীন। দাওয়াতে কেউ বাদ পড়েনি। সকলের কাছে পৌঁছেছে বিশেষ নিমন্ত্রণ।

তাঁরই প্রতিবেশি আলি। সাদাসিদে। সরলমনা। ভদ্র। গরিব। আত্মমর্যাবোধ সম্পন্ন। অলিমার দাওয়াত পেয়ে খুশি হলেন। স্বভাব অনুযায়ী সাধারণ পোষাকে রওয়ানা হলেন অলিমা অনুষ্ঠানে। সেখানে গিয়ে তিনি হতবাক। তাকে কেউ অভ্যর্থনা জানাল না। আহলান বলল না। অভ্যর্থনায় যারা ছিল সবাই মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। সবার মুখে অহমের ছাপ। তাকে দেখে কেমন হেলা হেলা ভাব। কারণ তার পোষাকে আভিজাত্য নেই। কোনো সাওয়ারিতে আরোহন করে সে আসেনি। এমন ভাবমূর্তি দেখে মনে মনে দারুণ আহত হলো। মর্যাদাবোধে দারুন আঘাত পেলো। মরমে মরে গেলো।

খানিক দাঁড়িয়ে মূল অনুষ্ঠানের দিকে এগুলো। যেখানে মেহমানরা উপবিষ্ট। দুকদম না এগুতেই এক চাকর তাকে থামিয়ে দিল। আরে আরে কোথায় যাচ্ছ। ওখানে বিশেষ মেহমানদের স্থান। তোমার যায়গা ওদিকে। আমার সাথে এসো। সাধারণদের এ জায়গা এটি। সে দস্তরখানের দিকে নজর বুলাল। দেখল, অনেক মানুষ একসাথে। একেবারে নীচু শ্রেণির লোকদের ভীড়। বড় পাত্র। অল্প খাবার। অথচ অনেক মানুষ। সবাই খাবার নিয়ে টানা হেঁচড়া করছে। শোরগোল হৈ চৈ। কার আগে কে খাবে, এমন প্রতিযোগিতা।

মনে মনে ভাবল, ওদের সাথে খাবার খাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এ খাবার একদম নীচু মানের। আমাকে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে। এমন একটা পথ বের করতেই হবে, যাতে ভি আই পি মেহমানদের সাথে বসা যায়। খানিক ভেবে সে সেখান থেকে বের হয়ে গেল। খুবই দ্রুত। যাত্রা তার বাড়ি মুুখি। একটা দৃঢ় সংকল্প মনে মনে। ঘরে প্রবেশ করল।

লাল আলখাল্লাটা পরল। তার উপর সোনালি কালারের ‘আবা’-টাও। মাথায় তেজারতি পাগড়ি। আয়নায় চেহারাটা একবার দেখল। না। এখন পুরো জমিদার জমিদার ভাব। নাদুস নুদুস গাধাটার পিঠে চড়ে ফের চললো বিয়ে বাড়িতে। এবার নিশ্চই তারা আমায় বিশেষ মেহমান ভাববে।

এ অবস্থায় বিয়ে বাড়িতে পৌছতেই রিসিপশানের লোকেরা বলতে লাগল, আহলান হে মহান অতিথি। আমাদের অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম। আপনার আগমনে আমাদের এ অনুষ্ঠানের শোভা বহুগুন বর্ধিত হয়েছে। চলুন আপনার আসন অলংকৃত করুন।  একজন বলল, আমাদের এ আয়োজন আপনাদের মর্যাদার কাছে নগন্য। মেহমানদের একজন বলল. আসুন। আসন গ্রহণ করুন। আলি বিশেষ মেহমানদের সাথে তার আসনে আসিন হলেন।

আপ্যায়নের লোকেরা খুবই বিনয় ও নিপুনতার সাথে খাবার পরিবেশন শুরু করল। মজাদার কয়েক প্রকারের শরবত। রকমারি উন্নত খাবারের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন। বিনম্র অনুরোধ, সবাই খাবার গ্রহণ করুন। সবাই মুচকি হেসে খাবার খাওয়া শুরু করল। আলির চেহারায় খাবারের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। যেন কি ভাবছে। চেহারায় বিষয়টা পষ্ট।

খানিক পর সে তার পাগড়িটা খুলল। বলল, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সোপের পাত্রটা হাতে নিয়ে পাগড়িতে তা ঢালা শুরু করল। মুখে বলতে লাগল, পান করে হে পাগড়ি। তৃপ্তি আর আনন্দের সাথে। পান কর। আর স্বাদ আস্বাদন কর। এবার আরেকটা পাত্র হাতে নিয়ে তা আলখেল্লার উপর ঢালছে আর বলছে, হে বরেন্য অতিথি। অনুষ্ঠানের শোভা। সম্মানের পাত্র। মনভরে আহার গ্রহণ কর। পরিতৃপ্ত হও। সবাই খাবার দাবার ছেড়ে হা করে দেখছে তার কা-। হতবাক হয়ে তার কাছে বলতে লাগল, এ কি করছেন আপনি। এ কি করছেন আপনি। আরে কি হলো। থামুন। থামুন। নিজেকে সামলাান।

আলি হেসে বলল, জেনে বুঝেই আমি এ কাজ করছি।

আমি নই। এগুলো পোষাকরই প্রাপ্য। এ পাগড়ি । এ জামা । আমার চেয়ে অনেক দামি। তাদের কাছে আমি মূল্যহীন। এ  খাবার, এ পানীয় এগুলো তাদের সৌজন্যে। আমার জন্য নয়। যদি এগুলো না হতো, আমি আপনাদের সাথে বসতেই পারতাম না। আর কেউ আম্মায় সম্মান দেখাত না।

 

 

Comments

comments






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress