Homeমাসয়ালা-মাসায়েল

তিনটি মাসয়ালা : মহিলাদের জানাযায় উপস্থিত হওয়া, কাগজ দিয়ে হাত মোছা, প্রাণীর ছবি টানানো

তিনটি মাসয়ালা : মহিলাদের জানাযায় উপস্থিত হওয়া, কাগজ দিয়ে হাত মোছা, প্রাণীর ছবি টানানো
Like Tweet Pin it Share Share Email

প্রশ্ন: গত দুই মাস আগে আমার এক আন্টি মারা যান। জানাযা হয় আন্টির বাসা থেকে ৫/৭ মিনিটের দূরত্বে এক মসজিদে। আন্টির বান্ধবীরাসহ অন্যান্য অনেক মহিলা আন্টির জানাযায় শরীক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। তখন উপস্থিত এক মুরুব্বীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রথমে জানতে চান ওখানে মহিলাদের নামাযের আলাদা ব্যবস্থা আছে কি না? মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে একথা তাঁকে জানানো হলে তিনি বলেন, তাহলে মহিলারা জানাযায় যেতে পারবে। তখন মহিলারা জানাযায় শরীক হয়। মহিলাদের অধিকাংশই ছিল বেপর্দা।

আমার তখন ঐ মুরুব্বীর কথায় একটু সন্দেহ হয় কিন্তু নিশ্চিত না হওয়ায় কিছু বলা থেকে বিরত থাকি। হুযুরের কাছে জানতে চাই মহিলাদের জন্য জানাযায় শরীক হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের বিধান কী?

উত্তর:

মহিলাদের জন্য জানাযার নামাযে বের হওয়া জায়েয নয়। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবা তাবেয়ীন থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে। তাবেয়ী যার ইবনে আব্দুল্লাহ রাহ. বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَّبِعُ جِنَازَةً، فَإِذَا بَامْرَأَةٍ عَجُوزٍ تَتَّبِعُهَا، فَغَضِبَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى عُرِفَ الْغَضَبُ فِي وَجْهِهِ، فَأَمَرَ بِهَا فَرُدَّتْ، ثُمَّ وُضِعَ السَّرِيرَ، فَلَمْ يُكَبِّرْ عَلَيْهَا حَتَّى قَالُوا: وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَقَدْ تَوَارَتْ بِأَخْصَاصِ الْمَدِينَةِ قَالَ: ثُمَّ كَبَّرَ عَلَيْهَا

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার সাথে ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন একজন বৃদ্ধ মহিলাও জানাযার সাথে সাথে আসছে। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রোধান্বিত হলেন এবং তার মুখম-লে ক্রোধের ছাপ ফুটে উঠল। তখন তার নির্দেশে ঐ বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দেয়া হল। এরপর খাটিয়া রাখা হল কিন্তু তিনি জানাযা শুরু করলেন না। যখন লোকেরা বলল,  ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে হক (সত্য)সহ প্রেরণ করেছেন ঐ মহিলা শহরের বাড়িঘরের আড়াল হয়ে গেছে, তখন তিনি জানাযার তাকবীর বললেন। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস ৬২৯০)

উম্মে আতিয়্যা রা.-এর বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন-

وَنَهَانَا أَن نَخْرُجَ فِي جَنَازَةٍ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানাযায় বের হতে নিষেধ করেছেন। (আলমুজামুল কাবীর তবারানী ২৫/৪৫)

আমর ইবনে কায়স রাহ. বলেন,

كُنَّا فِي جِنَازَةٍ وَفِيهَا أَبُو أُمَامَةَ فَرَأَى نِسْوَةً فِي الْجِنَازَةِ فَطَرَدهُنَّ .

আমরা এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। আবু উমামাও সেখানে ছিলেন। তিনি দেখলেন জানাযায় কিছু মহিলাও এসেছে। তখন তিনি তাদের সরিয়ে দিলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ১১৪০৮)

মুহাম্মাদ ইবনুল মুনতাশির রাহ. বলেন,

كَانَ مَسْرُوقٌ لاَ يُصَلِّي عَلَى جِنَازَةٍ مَعَهَا امْرَأَةٌ.

মাসরূক রাহ. ঐ জানাযা পড়তেন না, যে জানাযায় কোনো মহিলা উপস্থিত আছে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-১১৪০৩)

শা‘বি রাহ.-কে জিজ্ঞাসা করা হল, মহিলারা কি জানাযার নামায পড়বে? উত্তরে তিনি বললেন,

لَا تُصَلِّي عَلَيْهَا طَوَاهِرَ وَلَا حَائِضًا

না, মহিলা জানাযার নামায পড়বে না, চাই সে পবিত্র হোক কিংবা ঋতুমতি। (মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৬২৯৭)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরোল্লেখিত হাদীস এবং সাহাবা-তাবেয়ীনের আছারগুলো থেকে এক থা স্পষ্ট যে, মহিলাদের জন্য জানাযার উদ্দেশ্যে বের হওয়া জায়েয নয়।

সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য জানাযায় অংশগ্রহণ করা ঠিক হয়নি। অবশ্য মহিলারা ঘরে থেকেই মৃতের জন্য ঈসালে সাওয়াব ও মাগফিরাতের দুআ করতে পারে।

প্রকাশ থাকে যে, দ্বীনী বিষয়ে না জেনে মন্তব্য করা ঠিক নয়। প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে লোকটির না জেনে মাসআলা বলা অন্যায় হয়েছে।

-হালবাতুল মুজাল্লী ২/৬০৭; শরহুল মুনয়া পৃ. ৫৯৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩২

প্রশ্ন: কোনো কোনো হোটেলে নাস্তা বা খানা খাওয়ার পর হাত মোছার জন্য পেপারের টুকরা দেওয়া হয়। জানার বিষয় হল, পেপারের টুকরা দিয়ে হাত মোছা যাবে কি?

উত্তর:

কাগজ ইলম ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম। আর ইলমের সকল মাধ্যম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানযোগ্য। তাই পেপারের টুকরা দিয়েও হাত মোছা ঠিক নয়। এটা আদব পরিপন্থী কাজ।  আলমুহীতুল বুরহানী ৮/১২৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩২২

প্রশ্ন: আমার বাবাকে তার এক বন্ধু একটি ওয়ালম্যাট গিফট করেছে। তাতে কিছু প্রাণীর ছবিও আছে। একজন দেখে বললেন, এভাবে স্পষ্ট প্রাণীর ছবি টাঙিয়ে রাখা জায়েয হবে না। আপনি প্রাণীর চোখগুলো কেটে দিন। বাবা তাই করলেন; সবগুলো প্রাণীর চোখ কেটে দিয়ে ওয়ালম্যাটটি ঘরে টাঙিয়ে দিলেন। কিছুদিন আগে একজন আঙ্কেল বললেন, তিনি একজন আলেমের কাছে শুনেছেন যে, শুধু চোখ কাটলেই হবে না বরং পুরো চেহারা মুছে দিতে হবে। অন্যথায় ঐ ছবি টাঙিয়ে রাখা জায়েয হবে না। হুযুরের কাছে এ বিষয়ে সঠিক সমাধান জানতে চাই।

উত্তর:

কোনো প্রাণীর দৃশ্যমান ছবি টাঙানো বা দৃশ্যমান রাখা নাজায়েয। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ تَمَاثِيلُ أَوْ تَصَاوِيرُ.

ফেরেশতাগণ এমন ঘরে প্রবেশ করেন না যে ঘরে কোনো প্রাণীর ছবি বা প্রতিকৃতি আছে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২১১২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, জাবের রা. বলেন,

نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنِ الصُّورَةِ فِي البَيْتِ، وَنَهَى عَنْ أَنْ يُصْنَعَ ذَلِكَ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ছবি রাখতে ও ছবি অঙ্কন করতে নিষেধ করেছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস  ১৭৪৯)

আর প্রাণীর ছবির মূলই হল তার মাথার অংশ। যা দ্বারা প্রাণীর পূর্ণ রূপ ও পরিচয় স্পষ্ট হয়।

ইকরিমা রাহ. বলেন,

إِنَّمَا الصُّورَةُ الرَّأْسُ ، فَإِذَا قُطِعَ فَلاَ بَأْسَ.

ছবির মূল হল মাথা। মাথা যদি কেটে দেয়া হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ২৫৮০৮)

তাই মাথার অংশ কেটে বা মুছে দিলে তা আর ছবির হুকুমে থাকে না। কিন্তু মাথা ও চেহারা না মুছে শুধু চোখ মুছে দিলে প্রাণীর আকৃতি ও পরিচয় বাকি থাকে। তাই তা ছবির হুকুমেই থাকে।

ইবনে আবেদীন শামী রাহ. বলেন, প্রাণীর মূর্তি বা ছবির যদি মাথা কাটা থাকে তাহলে এমন ছবি ঘরে রেখে নামায পড়লে নামায মাকরূহ হবে না। চাই মাথা গোড়া থেকেই কেটে ফেলা হোক বা না কেটে পুরো মাথা একদম মুছে ফেলা হোক। কেননা স্বাভাবিকভাবে মাথা ছাড়া প্রাণীর উপাসনা করা হয় না। আর পুরো মাথার শর্ত করা হয়েছে। কেননা শুধু ভ্রু মুছে দেয়া বা চোখ কেটে দেয়া যথেষ্ট নয়। কেননা এসব ছাড়াও প্রাণীর উপাসনা হয়। (রদ্দুল মুহতার ১/৬৪৮)

সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে ঐ আলেমের কথাই সঠিক যিনি বলেছেন, ছবির শুধু চোখ কেটে দিলে সেটা টাঙানো বেধ হয়ে যাবে না; বরং পুরো চেহারা মুছে দিতে হবে।

-জাওয়াহিরুল ফিকহ ৭/২৫৩

 

Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Need Help? Chat with us