Main Menu

একজন সাহাবী অন্য একজন সাহাবীর স্ত্রীর হাত স্পর্শ করার পর যে পরিমান অনুতপ্ত হলেন

sahabi

খাঁটিভাবে তাওবা করতে পারলে আল্লাহ তার বান্দাকে ক্ষমা করবেনই। হোক সে বড় পাপী । পবিত্র কালামে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন –‘‘তারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা কোন মন্দ কাজে জড়িত হয়ে নিজের উপর জুলুম করে ফেলে , তখনই তারা যেন আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য তাওবা বা ক্ষমা প্রার্থনা করে । আর আল্লাহ ছাড়া তাদের পাপ আর কে ক্ষমা করবে ?’’ (সূরাহ আলে ইমরান-১৩৫)

পবিত্র কুরআনের উল্লেখিত আয়াতকে সামনে রেখে সত্যিকার মুমিনের খাঁটি তাওবার বিরল একটি ঘটনা সম্পর্কে আলোকপাত করছি । এ ঘটনাটি আমার উস্তাদের মুখ থেকে শুনেছি কয়েকবার । উস্তাদের মুখ থেকে যখন শুনতাম তখন আমাদের মনকে এমন আলোড়িত করত, যার ফলে তাওবার প্রেরণা বেড়ে যেত । আমি পারব না সেভাবে উপস্থাপন করতে । তবে পাঠকার এমন ভাব নিয়ে পড়বেন , যেন তাওবার আগ্রহ পয়দা হয় । হযরত আলী (রাযি.) থেকে বর্ণিত , মদীনা শরীফে হিজরতের পর যখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে সা’লাবাতুল আনসারীর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সর্ম্পক গড়ে ওঠে । এরপর মহানবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হলেন , তখন তার সাথে সায়ীদ বিন আবদুর রহমান জিহাদে গমনের প্রস্তুতি নিলেন । আর তার বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব-ভার অর্পণ করলেন হযরত সা’লাবার উপর । সা’লাবা পর্দার আড়ালে থেকে নিয়মিত সায়ীদের বাড়ির প্রয়োজনীয় কাজ করে যাচ্ছেন । এদিকে শয়তান আস্তে আস্তে সা’লাবার মনে কুমন্ত্রনা দিতে লাগল ।

এদিকে শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে সা’লাবা পর্দা সরিয়ে গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন এবং সায়ীদের স্ত্রীর হাত স্পর্শ করলেন । এই অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে সায়ীদের স্ত্রী তাকে ভৎসর্না করে বললেন- ‘‘আপনার যে ভাই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে গিয়েছেন , আপনি কি তার আমানতে খিয়ানত করতে চান  ?’’এ কথা শ্রবণ করামাত্র সা’লাবার অনুতাপের ঝড় সৃষ্টি হলো । তিনি সঙ্গে সঙ্গে এক চিৎকার দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে তাওবা করতে করতে পাহাড়ের দিকে দৌড়ে গেলেন ।

এদিকে জিহাদ শেষে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যাবর্তন করলেন । তখন সবাই নিজ নিজ গাজী ভাইদের সংবর্ধনায় উপস্থিত হলেন । কিন্তু সা’লাবাকে দেখা গেল না । সায়ীদ বাড়ি এসে সবকিছু জানতে পেরে সা’লাবাকে অনুসন্ধান করতে লাগলেন। অবশেষ তাকে পেয়ে বললেন , ভাই সা’লাবা! তুমি আমার সঙ্গে বড়দের দরবারে চল তারা কি বলে । সা’লাবা বললেন , আমি এভাবে যাবো না । আপনি আমার হাতকে ঘাড়ের সাথে বেঁধে গোলামের ন্যায় টেনে –হেচড়ে নিয়ে যান , আমি অপরাধী । শেষ পযর্ন্ত তা-ই করা হলো । ওদের সাথে চললেন সা’লাবার কন্যা খামসানাও , তার পিতা আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য । প্রথমে তাকে নিয়ে গেল হযরত উমর (রাযি.) এর কাছে । তিনি ঘটনা শুনে সা’লাবাকে প্রহার করতে চেয়েছেন । সায়ীদ তা করতে না দিয়ে নিয়ে গেলেন হযরত আলী (রাযি.) এর দরবারে। তিনি বললেন – হে সা’লাবা ! তোমার ব্যাপারে আমার কাছে কোন ফয়সালা নেই । তুমি আমার দরবার থেকে চলে যাও । এরপর চলে গেলেন হযরত আবু বকর (রাযি.) এর নিকট । সায়ীদের কাছ থেকে তার ভাই সা’লাবার বর্ণনা শোনার পর বললেন – হে সায়ীদ ! তোমার ভাইয়ের আল্লাহর দরবারে কি ফয়সালা আমি জানি না । এ বলে তিনিও তাকে প্রত্যাখ্যান করলেন । অবশেষে গেলেন দয়াল নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মহান দরবারে । তিনিও বললেন , তোমার মত পাপীর কোন উপায় নেই । অবশেষে নিরাশ হয়ে বেরিয়ে আসলেন দরবার থেকে । তার এ অপরাধের কারণে কেউ কোন পাত্তা দিলেন না । তখন কন্যা খামসানা তার পিতা সা’লাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল- আজ থেকে আপনি আমার পিতা নন , যে পযর্ন্ত না আপনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীগণকে সন্তুষ্ট করবেন । কোন জবাব না দিয়ে সা’লাবা (রাযি.) পুনরায় পাহাড়ের দিকে চলে  গেলেন এবং পাগলের ন্যায় চিৎকার দিতে লাগলেন । আর বলতে লাগলেন – হে আল্লাহ ! তোমার দরবারে আমার কি কোন ক্ষমা নেই? আমি আজ নিরাশ্রয়, নিরুপায় । কিন্তু হে পরওয়ারদেগার ! আপনি আমার মালিক , আমি আপনার গোলাম । আপনার মহান দরবারে এ গোলাম হাজির হয়েছে । যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন তবে আমার খুশির সীমা থাকবে না । আর যদি আপনি আমাকে নিরাশ করেন , তবে আমার ন্যায় হতভাগা আর কেউ নেই । এই বলে আল্লাহর দরবারে অনবরত ক্রন্দন করে গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন । এভাবে সারারাত তিনি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন, কাঁদতেন । একদা আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ফেরেশতা এসে জিজ্ঞাসা করলেন , হে আল্লাহর রাসূল ! আল্লাহ পাক জানতে চেয়েছেন , এ বিশ্বজাহান এবং সমগ্র মানবজাতির স্রষ্টা কি আল্লাহ পাক নন ? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন – নিঃসন্দেহে আল্লাহ পাক সবকিছুর স্রষ্টা । ফেরেশতা বললেন – আল্লাহ পাক ঘোষণা করেছেন , আমি আমার গুনাহগার বান্দাকে ক্ষমা করেছি । এ সু–সংবাদ তাকে পৌঁছিয়ে দিন । নবীজী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে বললেন – কে আছো সা’লাবাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে ? তৎক্ষণাত হযরত আবু বকর ও উমর (রাযি.) এবং তাদের পাশাপাশি আলী ও সালমান (রাযি.) দন্ডায়মান হয়ে গেলেন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সবাইকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন । তারা সা’লাবাতুল আনসারীর অনুসন্ধান করতে করতে মদীনার উপকন্ঠে উপস্থিত হয়ে লোকদেরকে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারা সমস্বরে বলে উঠল – আপনারা কি জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী ব্যক্তির সন্ধান করছেন ? তারা বলল হ্যাঁ । তখন একজন বলল যে , তিনি রাত্রিকালে এখানে আসেন এবং এই বৃক্ষতলে উপন্থিত হয়ে উচ্চস্বরে আল্লাহর দরবারে কাঁদতে থাকেন । এ কথা শোনার পর হযরত আলী ও সালমান (রাযি.) নির্দিষ্ট সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলেন । যথা সময়ে সা’লাবার সাথে তাদের সাক্ষাৎ লাভ হল । সা’লাবা স্বস্থানে অঝোরে কাঁদছিলেন । তারা সা’লাবার নিকট এসে বললেন , হে সা’লাবা ! চলুন । আল্লাহ পাক আপনাকে মাফ করেছেন । সা’লাবা জিজ্ঞাসা করলেন – আল্লাহর নবীকে আপনারা কি অবস্থায় দেখে দেখে এসেছেন ? তারা বললেন – আপনি যেমন আশা করেন তেমন অবস্থাতেই দেখে এসেছি । তিনি এখন আপনার উপর সন্তুষ্ট । তখন সা’লাবা তাদের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর দরবারে রওয়ানা হলেন । সা’লাবাকে নিয়ে তারা মসজিদে নববীতে হাজির হলে ফজরের নামাযের জামাআত শুরু হয়ে যায় । তারা সর্বশেষ কাতারে শরীক হন । নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম –এর কন্ঠে এ সূরাহ শ্রবণ করে সা’লাবা চিৎকার করে উঠলেন । আর যখন সূরাহ তাকাসুরের দ্বিতীয় আয়াতটি পাঠ করলেন , তখন সা’লাবা বিকট এক চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন । নামাযান্তে দয়ার নবী বললেন – তার মুখে পানির ছিটা দাও । তখন সালমান (রাযি.) বললেন – ইয়া রাসূলুল্লাহ সা’লাবা ইন্তেকাল করেছেন । এমন সময় তার কন্যা খামসানা পিতার মৃতদেহ দেখে কাঁদতে লাগলেন । তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন , হে খামসানা ! তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে , আমি তোমার পিতা এবং ফাতেমা তোমার বোন ? সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! অবশ্যই আমি সন্তুষ্ট । তারপর সা’লাবাকে দাফন করা হয় । দাফন কার্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অংশ নেন । রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর করে হাঁটছিলেন । দাফন কার্যের পর উমর (রাযি.) নবীজীকে জিজ্ঞাসা করলেন – হে আল্লাহর রাসূল ! কি কারণে আপনি সা’লাবার কবরের পার্শ্বে আপনার কদম মুবারক না রেখে আঙ্গুলের উপর ভর করে হাঁটছিলেন ? উত্তরে নবীজী বললেন – হে উমর ! সা’লাবার কবরে এত অধিক পরিমাণে ফেরেশতা জমা হয়েছিল যে, মাটিতে পা রাখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না । সা’লাবার তাওবা এমনভাবে কবুল হয়েছিল যে, অসংখ্য ফেরেশতা তার জানাযাতে শরীক হওয়ার জন্য এসেছিল । ( সুবহানাল্লাহ )

Comments

comments






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress