Main Menu

আলেম তো এমনই | মুহাম্মদ আতিক উল্লাহ

আবদুল্লাহ বিন আলী। আব্বাসী খিলাফত প্রতিষ্ঠার মূল যোদ্ধাদের একজন। অসম সাহসী বীর। চল্লিশ হাজারের মতো মানুষ তার হাতে মারা পড়েছে। উমাইয়া খিলাফতকে নির্মূল করতে গিয়ে আব্বাসী আন্দোলনের প্রবক্তারা যে নৃশংসতার পরিচিয় দিয়েছিল, তার তুলনা ইতিহাসে খুব কমই আছে। যেখানেই উমাইয়া বংশ কাউকে পেয়েছে, হত্যা করেছে।
আবদুল্লাহ বিন আলী দিমাশকে প্রবেশ করল বিজয়ীর বেশে। বেপরোয়া হয়ে প্রশ্ন করল,
– আজ কেউ আমার মুখের ওপর কথা বলার আছে এই শহরে?
-আপনার শত্রুদের কেউ বেঁচে নেই। কেউ আপনার মুখের উপর কথা বলার সাহস পাবে না। তবে ইমাম আওযায়ীর কথা ভিন্ন।
-তাকে আমার সামনে এখুনি হাজির কর!
সাথে সাথে লোক ছুটল ইমাম সাহেবকে ধরে আনতে। তিনি সংবাদ পেয়ে গোসল সেরে নিলেন। কাফন পরলেন। তার উপর নিত্য দিনের পোষাক পরলেন। লাঠিটা হাতে নিয়ে প্রাসাদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন।
আবদুল্লাহ বিন আলী বড় কর্মকর্তাদের আদেশ দিল, তোমরা দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাও। মারমুখো ভঙ্গিতে তরবারি উঁচিয়ে রাখো। যাতে সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
ইমাম সাহেব নির্ভিকচিত্তে মাথা উঁচিয়ে দরবারে প্রবেশ করলেন। দুপাশের কৃত্রিম ভীতিকরদৃশ্য আল্লাহভীরু ইমামের মনে বিন্দুমাত্র দাগ কাটতে পারল না। যেন কিছুই হয়নি এভাবেই হেঁটে গেলেন।
-তুমিই আওযায়ী?
– লোকে তাই বলেই আমাকে ডাকে।
ইমাম সাহেব পরে বলছিলেন,
-আমি তার দরবারে প্রবেশ করার আগেই নিজের প্রাণকে আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। কল্পনার চোখে ভাসছিল কিয়ামত দিনের দৃশ্য। আল্লাহ তায়ালা তার আসনে সমাসীন। একদলকে জান্নাতে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। আরেকদলকে জাহান্নামে। এমন দৃশ্যের সামনে দুনিয়াার জালেমকে আমার কাছে একটা মাছির মতোও মনে হয় নি। ভয় পাওয়া তো দূরের কথা!
-এই যুদ্ধে তো এতো রক্তারক্তি কান্ডঘটল, এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী?
আপনার দাদাজান আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেছেন, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,তিন কারণ ছাড়া একজন মুসলমানের রক্ত কিছুতেই হারাম হতে পারে না।
হাদিসটা শেষ করাই আগেই আবদুল্লাহ সীমাহীন রেগে গেলেন। তার অবস্থা দেখে ইমাম আওযায়ী রহ. গর্দান থেকে পাগড়ী তুলে তরবারির কোপ খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। উপস্থিত কর্মকর্তারাও রক্তের ছিটা থেকে বাঁচার জন্য যার যার পরিধেয় সামলে নিল।
আবদুল্লাহ প্রচন্ড ক্ষোভে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে আবার প্রশ্ন করল,
-আমি যে সব সম্পদ অর্জন করেছি বা যে সব ঘরবাড়ি দখল করেছি, সে সব সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কী?
-আল্লাহ কেয়ামতের দিন সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে আপনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। যেমনটা ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন ছিলেন। সম্পদগুলো হালাল হলে হিসাব নেওয়া হবে। হারাম হলে ইকাব (শাস্তি) দেওয়া হবে।
আবদুল্লাহর রাগ আরও বেড়ে গেলো। সবাই বুঝে গেল, চূড়ান্ত ও চরম কোনো সিদ্ধান্ত সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইমাম সাহেব তখন বিড়বিড় করে পড়ছেন,
হাসবিয়াল্লাহ…। আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। আমি তার উপরেই তায়াক্কুল করছি। তিনি মহান আরশের অধিপতি।
একটু পরে আবদুল্লাহ সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে বলল,
-ঠিক আছে।  আপনি চলে যান।
ইমাম সাহেবকে বড় অংকের টাকা দিলেন। ইমাম সাহেব সেটা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন।  উপস্থিত এক কর্মকর্তা টাকাটা গ্রহণ করতে বলল। ইমাম সাহেব থলেটা হাতে নিয়ে দরবারেই সব টাকা বিলিয়ে দিলেন। থলেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গটগটিয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এই ঘটনার পর ইমাম সাহেবের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা শতগুনে বৃদ্ধি পেলো। কিছুদিন পর তিনি ইন্তেকাল করলেন। আবদুল্লাহ বিন আলী তার কবর যিয়ারত করতে গিয়ে বলল,
-আল্লাহর কসম! আমি আপনার মতো কাউকে ভয় করতাম না। আপনাকে দেখে আমার মনে হয়েছিল আমার সামনে একটা উদ্যত সিংহ দাঁড়িয়ে আছে।

 কোঁচড় ভরা মান্না : ৮২

Comments

comments






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress