Homeসমসাময়িক গল্প

আঁধারের পরে- পর্ব- ১

আঁধারের পরে- পর্ব- ১
Like Tweet Pin it Share Share Email

আমি এখন পূর্ণ বয়স্ক যুবতী । জীবন থেকে হারিয়ে গেছে আঠারোটি বছর। আমি এক অবলা । হ্যাঁ সত্যিই আমি অবলা । কারণ আমার জীবনের অনুভূতিগুলো কখনো কারো কাছে বলতে পারিনি । না দুঃখের কথা, না সুখের কথা । তবে আজ বলবো, সব বলবো। –

আমি মুনিয়া।
আমার বয়স তখন বছর চারেক হবে । আমার চারপাশ ঘিরে শুধু বাবা আর মা। আমরা থাকতাম শেরপুরের এক কলোনিতে। বাবা মায়ের ঝগড়া ঝাটির মাঝেই আমার বড় হওয়া। যদিও মা ছিল মনোহরণী। একবার তাকালে দ্বিতীয়বার কেউ চোখ ফিরাতে পারতো না। মাঝে মাঝে মাকে বাবা প্রচণ্ড মারধর করতেন । আর আমি ভয়ে চুপসে থাকতাম। বাবা চলে যাওয়ার পর মা আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতো।
একদিন ।

আমি যথারীতি বাবা মায়ের মাঝখানে ঘুমিয়ে আছি । রাতে হঠাৎ কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে দেখি মা কাঁদছেন আর বাবা মাকে কী যেনো বোঝাচ্ছেন । তারপর হঠাৎ করে মা জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। সেদিন আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম।

সংসারের প্রতি বাবার আগ্রহ দিন দিন কমছিলো। মা আমাকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতে লাগল।
চাল থাকে তো ডাল থাকে না, ডাল থাকে তো নুন থাকে না। এমন টানাটানির মাঝে হঠাৎ করেই মা অসুস্থ হয়ে পড়লো। ভীষণ অসুস্থ। মাকে এ অবস্হায় রেখে বাবা চলে গেলেন বাসা ছেড়ে। পরে মামা এসে মাকে হাসপাতালে ভর্তি করালেন। পরিক্ষা নিরিক্ষার পর জানা গেল মায়ের ব্লাড ক্যান্সার। বেশি দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে। এর মাঝে বাবা একদিনও দেখতে এলেন না মাকে।
দশদিন পর সাদা কাফনে মুড়িয়ে উঠানে রাখা হলো মাকে। বাবা সেদিনও এলেন না। শেষপর্যন্ত বাবাবিহীন মাকে দাফন করা হলো। আমি বারবার মাকে খুঁজছিলাম, বারবার মাকে ডাকছিলাম। কিন্তু মা আমাকে একা রেখেই চলে গেলো। সেদিনের স্মৃতিগুলো চোখের তারায় বড় ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠে। মায়ের চেহারাটা কোনভাবেই মনে করতে পারি না। আপন মানুষের চেহারা নাকি কখনোই মনে রাখা যায় না, কথাটা সত্যি তাহলে।

2/

মা তো চলে গেল কিন্তু আমি?
বাবা আমাকে একটাবারের জন্যও দেখতে এলেন না । আর বাবা মায়ের যেহেতু লাভ ম্যারেজ ছিলো তাই দাদু বাড়ি থেকেও কেউ এলো না। আমি নানুর কাছেই থাকতে লাগলাম। আমার মা আর মামা ছিলেন দু ভাই বোন । আমার দিকে তাকিয়ে নানু একমাত্র মেয়েকে হারানোর কষ্টটা ভুলে রইলেন ।
পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হলাম ।
মেধাবী হওয়ায় ভালোই চলছিল লেখাপড়া । সবার আদরে আদরে আহ্লাদি হয়ে উঠেছিলাম দিন দিন । ক্লাস ফাইভে টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেলাম । সবার আদর আরো বেড়ে গেলো । তবে বাবা মাকে মাঝে মাঝে মিস করতাম । মায়ের চেহারাটা কোনভাবেই মনে করতে পারতাম না । তাই নানুর ঘরে গিয়ে মার ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা দেখতাম । কারণ মাকে আমি ভুলতে চাই না ।

সবে মাত্র ক্লাস সিক্সে উঠেছি । হঠাৎ একদিন বাবা এলেন । বাবাকে দেখে এতদিনের জমানো রাগ, ক্ষোভ, আর ঘৃণার আবরণ ছিড়ে কোথায় যেনো ভালোবাসা উথলে উঠলো । আমি অঝোরে কাঁদছি । বাবা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন । নানুকে বললেন, তিনি আমাকে নিতে এসেছেন । শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন নানু । আমাকে ছাড়া নানু কিভাবে থাকবেন!
শেষ পর্যন্ত বাবা জয়ী হলেন । বাবার সাথে চলে এলাম কলোনির সেই পুরনো ঠিকানায় ।

3/

দীর্ঘ ছ’বছর পর এলাম কলোনিতে । নানুর জন্য খুব খারাপ লাগছে । বাসার ভেতরের অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত । নতুন মাকে দেখলাম । শ্যামবর্ণের এক দীর্ঘদেহী মহিলা । শুনেছি মা মারা যাবার দুদিন পরেই বাবা ওনাকে বিয়ে করেছিলেন। পরকীয়া চলছিলো আরো আগথেকেই । ধারণা করলাম, এর জের ধরেই হয়তো বাবা মায়ের সাথে ঝগড়া ঝাটি করতেন, মায়ের গায়ে হাত উঠাতেন । মহিলার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা হলো । কিন্তু কিচ্ছু করার নেই । এখন থেকে সেই হলো এ বাড়ীর কত্রী।
তার কথামতোই এ বাড়ীতে চলতে হবে ।

আমি ছাড়া বাবার আর কোন সন্তান ছিল না । আমাকে ভালোই কেয়ারিং করতে লাগলেন তিনি।
ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করালেন। সবকিছু মিলিয়ে ভালোই লাগছিলো। কিন্তু ছোটমায়ের আচরনগুলো ভালো লাগছিলো না। আমার দিকে কেমন শীতল চোখে চাইতো। যদিও আমার দিক থেকে কোন সমস্যা হয়নি। আমি আমার নিজের কাজ নিজেই করতাম। আবার তাকেও রান্নাবান্নার কাজে সাহায্য করতাম। যেগুলো নানু বাড়ীতে কখনোই করিনি। এভাবেই কাটলো কটা দিন।
একদিন বাবার সাথে খেতে বসেছি । ছোটমা বাবাকে বলল – আজকাল ঘরে খাওয়ার মানুষ বেড়েছে, সাথে খরচও বেড়েছে। এতো মানুষের খরচ তুমি একা চালাতে পারবা? বাবা বললেন- তেমন আর কি, পারবো।
ছোটমার কথাগুলো শুনে আমার ভীষণ কষ্ট হলো । আমি কি বাইরের কেউ? আমি কি বাবার সন্তান নই? বাবা ভালো মানের চাকরি করেন । বাবার বেতন তো খারাপ না! মাকে মনে পড়লো । মা কাছে থাকলে তো কখনো এমন হতো না।

4/

আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। কিন্তু কী করবো? স্থির করলাম, টিউশনি করব।
ছোট ছোট বাচ্চাদের কে পড়াবো। কদিন পর শুরুও করলাম।
প্রতি মাসে মোট তিন হাজার টাকা পাই। আর সবগুলো টাকাই ছোট মাকে দিয়ে দিতে হয়। কড়ায় গন্ডায় হিসেব নেয় সে। এক টাকাও নিজের জন্য রাখতে পারি না। তার কথায়, এটা আমার থাকা খাওয়ার বিল। সামনে থেকে নিজের পড়ার খরচটাও নিজেকে চালাতে হবে। বুঝতে পারছি স্টেপ বাই স্টেপ আমার উপর টর্চার চালানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সে।

ক্লাস এইটে উঠলাম। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। স্কুলে গেলে ইদানিং ছেলেরা আমার দিকে তাকিয়ে থাকছে। আমি বিব্রত বোধ করছি। একদিন বাবাকে বললাম, বাবা আমার একটা বোরকা লাগবে ।
বাবা বললেন – কেন?
বললাম – স্কুলে গেলে ইদানিং ছেলেরা খুব বিরক্ত করে।
হঠাৎ আমার ছোটমা বলে উঠল- বাবার কাছ থেকে টাকা বের করার মতলব না? তুমি দেখতে কি এমন যে ছেলেরা তোমার দিকে তাকিয়ে থাকবে?
বুঝতে পারলাম, সে আমার সৌন্দর্য নিয়ে ঈর্ষান্বিত।
চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে এলো আমার। বাবার কাছ থেকে কি আমি একটা বোরকাও পেতে পারি না!! ?

চারমাস পর অনেক কষ্টে আরেকটা টিউশনি যোগার করলাম। কিন্তু এটার কথা ছোটমাকে জানালাম না।
মাস শেষে এ টাকাটা দিয়ে একটা বোরকা কিনলাম ।
এরপর শুরু হলো জিজ্ঞাসার পর জিজ্ঞাসা। বোরকা কোত্থেকে এনেছি? বললাম – কিনেছি।
বোরকা কেনার টাকা কোত্থেকে এনেছি?
আমি চুপ করে রইলাম । এতে সে বাবাকে গিয়ে বলল – আমি টাকা চুরি করে বোরকা কিনেছি ।
বাবা শুনে আমাকে ভীষণ ভাবে মারলেন।
আমাকে একটাবারের জন্যও জিজ্ঞেস করলেন না, কথাটা সত্যি কিনা। ওদিকে নানুর সাথেও যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না ঐ মহিলা।
এভাবে প্রতিদিন এক একটা অজুহাতে বাবার হাতে মার খাওয়াতে লাগল আমাকে।

▪▪▪▪▪▪▪▪▪▪

চলবে…

লেখিকা – ফিরদাউসি মাহমুদ

Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *