Homeসমসাময়িক গল্প

অবশেষে তুমি এলে

অবশেষে তুমি এলে
Like Tweet Pin it Share Share Email

বর্ষার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি । পুঁইপাতার মাচানে কালো-সবুজ বোঁটা । আর চারদিকে ভেজা বাতাসের শীতল ছোঁয়া । জানালার কাঁচ ঘেষে বসে আছে লাবনি । মনের মাঝে ব্যথার ঝর । সে কি আসবে?
বাড়ির পেছনে কঁচুর বন । কচুপাতায় বৃষ্টির পানিগুলো বাতাসে কেমন দুলছে । বড় অস্থির লাগছে লাবনির মনটা । তার জীবনটাও কি এমন; কঁচুপাতার পানির মত? সে কেন আসে না? আসবে তো?
লাবনির মনে পড়ে; বিয়ের পরের দশটা দিন যেন কেটে গিয়েছিল সপ্নের মত । প্রচন্ড ভালোবেসেছিলো লাবনি তাকে । তবুও কেন এমন হলো? কিন্তু এখন কী হবে লাবনির! সে তো অন্তঃসত্বা।

সাতটি মাস পার হলো । কেটে গেল আরো তিনটি মাস । তবুও সে এলো না । লাবনির পেটে প্রচন্ড ব্যথা । বাবুর দুনিয়াতে আসার সময় হয়েছে। হাসপাতালে নেয়া হবে লাবনিকে । এম্বুলেন্সে তোলা হল । রাস্তায় ভীষণজ্যাম ।

একঘন্টা, দুঘন্টা করে অনেক সময় পর হাসপাতালে পৌঁছলো ওরা । কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাবু আর এলো না । চলে গেল লাবনি কে ছেড়ে। চলে গেল ওপারে ।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে লাবনি। প্রচন্ড কষ্টে কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে । সবাই তাকে ফেলে কেন এমন চলে যায়?
শরৎ, হেমন্ত, শীত পার হলো; বসন্ত এলো । ফুল ফুটলো, কোকিল ডাকলো । তবুও সে এলো না ।
খেয়ে না খেয়ে লিভারে অসুখ হলো লাবনির। সেই থেকে ক্যান্সার । চেহারার সে হলদে আভা এখন আর নেই । তামাটে রঙের দেহটা সারাক্ষণ পরে থাকে বিছানায় । জানালার পাশে বসে থাকা হয় না এখন আর । চোখের নিচে ছাঁইপোড়া দাগ ।

দুদিন পর । লাবনির শিয়রঘিরে বসে আছে কতগুলো মানুষ । দোয়া, দুরূদ, কালিমা পড়ছে । হঠাৎ দরোজায় টোকা পরলো । পাশফিরে চাইলো লাবনি । খোলা দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে সে । স্তম্ভিত লাবনি, হতবিহ্বল । লাবনির শিয়রে এসে দাঁড়ালো মুশফিক । তার স্বামী , তার প্রিয়তম ।
: কেমন আছো লাবনি?
: ভালো ।
: দয়া করে আমায় ক্ষমা কর লাবনি!
: ক্ষমা চাইছো কেনো? আমার তো কোন অভিযোগ নেই তোমার প্রতি! এতদিন কোথায় ছিলে প্রিয়?
: সে অনেক কথা, থাক না ওসব ।
: অন্য নারীর আঁচলে বাঁধা?
: হুঁ । অনুতাপে ঘেমে গেছে মুশফিক ।
: তবে কেন এলে? চোখে অভিমানি অশ্রু লাবনির।
: তোমার জন্যে লাবনি!
: আমার এ অন্তিম সময়ে? কিছুটা বিদ্রুপাত্নক সুরে বললো লাবনি।
: কিন্তু আমি তোমায় যেতে দেব না প্রিয়া!
আমি যে সব ছেড়ে এসেছি! অনুনয় মুশফিকের গলায়।
: আমায়ও ছেড়ে দাও! রুদ্ধ হয়ে এলো লাবনির কন্ঠ ।
এরপর দুজনেই চুপচাপ ।
কিছুক্ষণ পর। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি । কালিমার শব্দগুলো ওঠানামা করছে লাবনির ঠোঁটে । অশ্রু ঝড়ছে দুচোখ বেয়ে । এরপর হঠাৎ নিস্তব্ধতা । লাবনির একটা হাত তুলে মুঠোয় পুরলো মুশফিক । ভীষণ ঠান্ডা! ধক্ করে উঠল কলিজাটা।
লাবনি, লাবনি! কয়েবার ডাকলো লাবনিকে । কিন্তু সাড়া দিলো না লাবনি! সাড়া দিবেও না কখনো। চোখের কোণে তখনও অশ্রু। যেন বলছে – চলে যাবে জানি । তবুও আমার কবরের শেষ মাটিটুকু দিয়ে যেও প্রিয়তম! ….

লেখিকা – ফিরদাউসি মাহমুদ

Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Need Help? Chat with us