Main Menu

সংক্ষিপ্ত জীবনি

শায়খ সৈয়দ আহমদ রহ. : সাধারণের বেশে অসাধারণ এক মানুষ | মাওলানা তাহমীদুল মাওলা

আমার আববার নাম সৈয়দ আহমদ চাঁন মিয়া। লোকে তাঁকে ‘চাঁন মিয়া সাব’ নামেই বেশি জানে। তাঁর বাবারনাম সৈয়দ আব্দুল খালেক। দাদা হাফিজ সৈয়দ আব্দুল হাকীম রহ.। জন্মস্থান হবিগঞ্জ জিলার চুনারুঘাটথানাধীন চানভাঙ্গা। তাঁর দাদা সৈয়দ আব্দুল হাকীম রহ. ছিলেন হযরত শাহজালাল (রহ.) এর জিহাদী কাফেলার সাথী হবিগঞ্জ(তৎকালীন তরফ রাজ্য)  বিজেতা বাগদাদ থেকে আগত সায়্যিদ নাসীরুদ্দীন সিপাহ্সালার-(রহ.)-এরবংশধর।  সৈয়দ আব্দুল হাকীম রহ. ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু মুত্তাকী বুযুর্গ। পড়াশোনা করেছেন আসামেরএক মাদরাসায়। মানুষ তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। জন্ম ও ইনতিকাল আনুমানিক ১৯২৩ খৃষ্টাব্দের দিকে একবার শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী রহ. সিলেট থেকে বানিয়াচংযাওয়ার পথে আমাদের বাড়িতে আসেন। তখন আববা মাতৃগর্ভে। দাদাজী আব্দুল খালেক (রহ.) হযরতেরকাছে আশু সন্তানের কল্যাণের জন্য দু‘আ চেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরই আববার জন্ম। হয়তো এ দু‘আইক্রমান্বয়ে আমাদের জন্য ছায়াদার মহীরূহের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। অতঃপর প্রায় দীর্ঘ ৮৭ বছর জীবন পারকরে বিগত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১২ খৃষ্টাব্দে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। শিক্ষা-দীক্ষা প্রাথমিক শিক্ষা বাবার কাছে সম্পন্ন করেন। এরপর বাবার কাছে স্বপ্নের দারুল উলূম দেওবন্দ গমনের বাসনাব্যক্ত করেন। কিন্তু বাবা ছিলেন সংসারত্যাগী। তাই তাঁর আশা পূর্ণ হয়নি। বরং উল্টো পড়াশোনা বন্ধ করেতখনি তাঁকে সংসার চালানোর দায়ভার সামলাতে হয়েছিল। মূলত আববার শিক্ষা-দীক্ষা ছিল অপ্রাতিষ্ঠানিক। হযরত মাদানী রহ. ও তাঁর হাতে গড়া একদল শিষ্য ওছাত্রবৃন্দ ছিলেন তাঁর শিক্ষক। এভাবেই তাঁর জীবন সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।হযরত মাদানীর একাধিক শাগরিদ ও খলীফা উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাঁকে দীর্ঘ দিন গবিগঞ্জ দ্বীনী শিক্ষাবোর্ড-এর সহ-সভাপতি হিসেবে রাখা হয়। ১৯৪৮ খৃ. রমযান মাসে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কাসার গমন করেন এবং হযরত মাদানীর হাতে বায়াত গ্রহণকরেন। ১৯৫৭ সালে হযরত মাদানী রহ.-এর জীবনের শেষ সফরে পশ্চিমবঙ্গের বাশকান্দিতে হযরতের একান্তসান্নিধ্যে রমযান অতিবাহিত করেন। হযরত মাদানীর সাথে আববার সারা জীবনের এই অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র তাঁর জীবনে এত গভীরভাবে রেখাপাতকরেছে যা কখনোই মুছে যাবার ছিল না। ‘হুব্ ফিল্লাহ’-মাদানী প্রেমের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত অন্যান্য আশিকানেমাদানীর মত তাঁর মাঝেও ছিল পূর্ণ মাত্রায়। জীবনের শেষ দিকেও ‘মদনী ছাব’ কথাটা তাঁর মুখে উচ্চারিতহলেই চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠত। শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী রহ.-এর ইনতিকালের পর তাঁর প্রবীণ খলীফা হযরত শায়খে বাঘা, হযরতশায়খে মোগলাবাজারী, হযরত শায়খে ফুলবাড়ী, হযরত শায়খে রায়পুরী, হযরত শায়খে বরুণী, হযরত শায়খেধুলিয়া প্রমুখের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর ইলম ও প্রজ্ঞায়, কর্ম ও কীর্তিতে শ্রেষ্ঠতম খলীফা হযরতবদরুল আলম শায়খে মোগলাবাজারী রহ.-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। এ সকল আলেমদের সাথে আববার সম্পর্ক ছিল শেখার জন্যই। তাঁর সাথে সব সময় একটি ছোট সাইজেরপকেটবই থাকত। এতে তিনি উলামায়ে কেরাম থেকে শিক্ষণীয় যে কোনো ঘটনা, নসীহত, দুআ-দরূদ, হাদীস, নসীহতমূলক শের-আশ্আর লিখে রাখতেন। কেউ কোন কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু বললে কিতাবের নাম ওপ্রকাশনাতথ্যসহ সবকিছু লিখে রাখতেন-সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে। এভাবে তাঁর পকেটবইগুলোর মধ্যে এরএকটি বিশাল সংগ্রহ জমা হয়ে আছে। অনেক সময় বিভিন্ন কিতাবের গুরুত্বপূর্ণ অথচ দীর্ঘ বিষয়ও নিজ হাতে লিখে রেখে দিতেন। এক সফরে কোনোএক সাথীর কাছে পেলেন ‘মাকতুবাতে শাইখুল ইসলাম’। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো কিতাবটি নিজের খাতায়স্পষ্টাক্ষরে লিখে নেন। অতঃপর তাঁর স্বভাবসুলভ নিয়মে খাতাটিকে বইয়ের মত মজবুত করে বাঁধাই করেছেন, যাতে মনে হয়- একটি বাঁধাই করা কিতাব। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পর আজও সেই লেখায় কোনো অস্পষ্টতাপরিলক্ষিত হয় না। খিলাফত লাভ শায়েস্তাগঞ্জ থেকে রেঙ্গা প্রায় ১০০ কিলোমিটারের পথ। তাও আবার যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্দিনের কথা। তবুতিনি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই রেঙ্গা ছুটে যেতেন শায়খের দরবারে। রমযানে নিয়মিতই সেখানে ই‘তিকাফ করতেন।  অল্প কিছুদিন পরই হযরত শায়খে রেঙ্গা তাঁকে বায়াত গ্রহণের উপযুক্ত বিবেচনা করত খিলাফত প্রদানকরেন। সুন্নতের অনুসরণ সুন্নতের অনুসরণ তাঁর স্বভাবে পরিণত হয়েছিল। শেষ বয়সে স্বাভাবিক চেতনা হারালেও সুন্নতের কথা তাঁরঠিকই মনে থাকত। জুতা পরার সময় জীবনে কোনদিন বাম পায়ের জুতা আগে পরেছেন বলে দেখিনি। কখনোবাম কাতে শুতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। সারাক্ষণ মাথায় টুপি থাকত। কখনো টুপি নিয়েই ঘুমিয়েপড়তেন। কথা-কাজ, চলন-বলন, ইবাদত-বন্দেগী সবকিছুতেই সুন্নত ছিল তাঁর নির্বিকল্প আদর্শ। সুন্নাতের খেলাফ কোনো কাজ দেখলেই তিনি তা শুধরে দেয়ার চেষ্টা করতেন। শাসনের যোগ্য হলে তাইকরতেন। শিশুদেরকে সুন্নতের তালীম দিতেন। বাম হাতে কোনো শিশুকে কিছু খেতে দেখলে ভীষণ রেগেযেতেন। তাঁর মুখের অতি সহজ সাবলীল দুটি বাক্য আমরা প্রতিনিয়তই শুনতাম- ‘হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেছেন’ ব্যস্। এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী ও জোরদার কথা। একটি দোকান একটি ইতিহাস কৈশোরে দুনিয়াত্যাগী বাবার সংসারের হাল ধরতে সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। জীবনে বহুধরনের ব্যবসা করেছেন। শেষে প্রায় ৫০ বছর একনাগাড়ে কাপড়ের ব্যবসা করেন। দীর্ঘ জীবনের ব্যবসায়তিনি চোখে পড়ার মতো জাগতিক বড় ধরনের উন্নতি করতে না পারলেও ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি লাভকরেন। কারণ, ব্যবসা তাঁর ইবাদত-বন্দেগীতে, দীনের খেদমতে, দীনের সংগ্রামে, দীনি শিক্ষার প্রচার ওপ্রসারে, মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদিতে প্রতিবন্ধক হওয়া দূরের কথা বরং এতে সহায়ক হিসেবেইপ্রমাণিত হয়েছে। ব্যবসার সাথে সাথে দীনের খেদমত ও মানবতার সেবার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল সমানপদচারণা। সতত ব্যবসায়েও সুন্নতে নববীর যথার্থই অনুসরণ করে গেছেন। কয়েকটি বিষয় এখানে উল্লেখকরা যায়। তাঁর দোকান সবসময়ই আঞ্চলিক উলামায়ে কেরামের অফিসঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। এখানে বসেই হতস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় উলামায়ে কেরামের গুরুত্বপূর্ণ যতসব পরামর্শ। এখানেই হত তাদের পারস্পরিক সাক্ষাত।এখানেই হত তাঁদের অবকাশযাপন, চা-পান চক্র।  আশপাশের চা দোকানীরা উৎসব করে চা বিক্রি করত। একবার প্রচন্ড শীতের মৌসুমে হযরত শায়খে বরুণী রহ. আসলেন তাঁর দোকানে মাঝরাতে। দোকানে আববাও এক কর্মচারী পৃথক পৃথক বিছানায় শুয়েছিলেন। হযরত আসার পর আববা নিজের বিছানা হযরতকে দিয়েপিছনে গিয়ে কর্মচারীকে না ডেকে একটি চাদর গায়ে বসে বসে রাত কাটিয়ে দিলেন! আববাকে স্মৃতিচারণ করতে শুনেছি-ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম সাহেব রহ. ইনতিকালের কয়েকদিন পূর্বেওআমার দোকানে চা খেয়ে গেছেন। একাশির নির্বাচনের সময় আববাজী ছিলেন খেলাফত আন্দোলনের জিলাআমীর (সভাপতি)। তাঁর দোকানটিই ছিল অফিস। তখন হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)ও এখানে এসেছেন। একবারনামাযের সময় হয়ে গেলে দোকানেই জামাত হল। হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) আববাকে ইমামতির জন্য সামনেপাঠিয়ে দিলেন। তাঁর ব্যবসায়িক জীবনের একটি বিরল বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘ সময়ে ডজন খানেকের বেশি লোক তাঁর দোকানেকাজ করেছে। এদের সকলেই তাঁকে ভালবাসত প্রবলভাবে। তিনি সব সময় তাঁদের দীনি উন্নতির প্রচেষ্টায়লেগে থাকতেন। ফলে দেখা যেত কিছু দিনের ব্যবধানেই নতুন বেনামাযী কর্মচারী নামাযের পূর্ণপাবন্দ হয়েযেত। মুখে দাঁড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। দোকানে বসে বসে নিজের কর্মচারীকে; বরং আশপাশের অনেকদোকানমালিক ও কর্মচারীকেও কুরআন শিক্ষা দিতেন। এভাবে তাঁর দোকানটা একটা কুরআন শিক্ষাগার-মক্তবে পরিণত হয়েছিল। মিস্ওয়াক ও আতর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় সুন্নত। তাই সুন্নতী আমলে মানুষেরসহযোগিতার লক্ষ্যে তিনি কাপড়ের সাথে অসঙ্গতি সত্ত্বেও এ ব্যবসা ছাড়েননি। ফলে একসময় তাঁর দোকানআতরের জন্য ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে। মানুষ বাজারে টাকা ভাংতি করার জন্য নানা পেরেশানিতে ভোগে। আববাজী রহ. যেন টাকা ভাংতি দেওয়াকেনিজের ব্যবসার কাজের একটা অপরিহার্য অংশ মনে করতেন। ভাংতি দেয়ার উদ্দেশ্যেই প্রতিদিন পাঁচশ টাকারভাংতির জন্য পাঁচটা করে একশ টাকার নোট একত্র করে একটি বান্ডিল বানিয়ে সামনে রেখে দিতেন। যে-ইআসত আপন কর্তব্য আদায়ের মতই ভাংতি দিতে থাকতেন। এজন্য বহু রকম ভোগান্তি ও পেরেশানি হাসিমুখেসয়ে যেতেন। সাধারণত অসামর্থবানকে কেউ বাকী দেয় না। তার বাকীর পরিমাণও ছিল বিপুল। আবার গরীব অসহায় শ্রেণীরএমন লোকদেরও বাকী দিতেন, যাদের থেকে পাওনা আদায়ের আশা ক্ষীণ। এর মাঝেই আল্লাহ তা‘আলা তাঁরব্যবসাকে বরকতময় করে দিয়েছিলেন। অত্যধিক প্রাচুর্য নয়; স্বচ্ছন্দে চলার মত প্রয়োজন মাফিক আয়েরব্যবস্থা আল্লাহ তাঁকে করে দিয়েছেন সারা জীবন। লোকে বলে মানুষ চেনার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম- লেনদেন। আল্লাহ তা‘আলার খাছ মেহেরবানীতে আববাজীরহ.-এর পুরো জীবনটাই ছিল অর্থনৈতিক লেনদেনের। কিন্তু সুদীর্ঘ প্রায় নববই বছরের জীবনে শত্রু-মিত্রনির্বিশেষে কেউ লেনদেন বিষয়ে তাঁর উপর কোনো কালিমা লেপন করা দূরের কথা, সন্দেহ পোষণ করারওকোন সুযোগ পায়নি কোনো দিন। মানুষ তাঁকে একটি নিরাপদ ব্যাংক মনে করে নগদ অর্থকড়ি ও মূল্যবান কাগজপত্র তাঁর কাছে আমানত রাখতএবং টাকা পয়সা ধার নিত। দোকানে একটি বিশালকায় লোহার সিন্দুক ছিল। সিন্দুক ভর্তি টাকা থাকত।প্রতিদিনের বেচা-কেনার মতই মানুষ টাকা জমা রাখত, আবার কেউ জমা টাকা তুলে নিত। দৈনন্দিন হিসাবেরখাতায় বেচা কেনার হিসাবের সাথে আমানত গ্রহণ ও প্রদানের দুটি পৃথক ঘর করা থাকত। মানুষ আমানতরেখে নিরাপত্তা পেত, শান্তি পেত এবং দু‘আ করত প্রাণভরে।Read More

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress