Homeঅলি-আউলিয়াগনের গল্প

স্মরণে শায়খুল হাদীছ আল্লামা আজিজুল হক রাহ | প্রফেসর মাওলানা গিয়াসুদ্দীন আহমাদ

স্মরণে শায়খুল হাদীছ আল্লামা আজিজুল হক রাহ | প্রফেসর মাওলানা গিয়াসুদ্দীন আহমাদ
Like Tweet Pin it Share Share Email

আজ আমি অতি ভারাক্রান্ত মনে আমার প্রাণ প্রিয় উস্তাদ ও পরম আত্মীয় শ্বশুর আববা হযরত শায়খূল হাদীছ আলামা আজিজুল হক (রাহ.) সম্পর্কে দু’ চার কথা লিখতে বসেছি, যাঁর সান্নিধ্যে আমি অর্ধ শতাব্দীরও বেশী সময় কাটিয়েছি এবং তাঁকে অতি নিবিড়ভাবে দেখার ও জানার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তিনি শুধু স্বদেশ বিখ্যাতই ছিলেন না, বরং উপমহাদেশের উলামায়ে কেরামের নিকট ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর অসাধারণ মেধা, প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা, পবিত্র কুরআন-হাদীসে তাঁর ব্যুৎপত্তি এবং কুরআন-হাদীসের অধ্যাপনা ও বিশদ ব্যাখ্যার জন্য তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি দেশ-বিদেশের আলেম সমাজের অন্তরে স্থান করে নিয়েছিলেন। অসাধারণ আলেমে দীন ও নবী কারীম সালালাহু আলাইহি ওয়াসালামের খাঁটি ওয়ারেছ হিসাবে সাধারণভাবে মানব জাতির জন্য এবং বিশেষভাবে মুসলমান জাতির জন্য তাঁর দরদ, স্নেহ-মমতা, ভালবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দীনী খেদমতের জন্য দেশ ও জাতির নিকট তিনি অমর হয়ে থাকবেন। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রাহ. বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সর্বজনীন পথনির্দেশক আলোকস্তম্ভ হয়ে থাকবেন।

হিজরী ১৩৭০ সন, মোতাবেক ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ। জামেয়া কোরআনিয়া লালবাগ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা বছর। অধম ১৩/১৪ বছর বয়সে অত্র মাদ্রাসায় ‘কাফিয়া’ জামাতে ভর্তি হয়। তখন ৫০ এর দশকে শায়খুল হাদীছ (র) ত্রিশোর্ধ বয়সের প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা একজন যুবক শিক্ষক। কিন্তু সেকালেই শিক্ষক পরিমন্ডলে তাঁর সুনাম সুখ্যাতির অবস্থা ছিল বিস্ময়কর। পবিত্র কুরআন-হাদীছ ও আরবী সাহিত্যে তাঁর সমধিক পারদর্শিতার কথা সকলের মুখে মুখে। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর নিকট আমাদের ‘নফহাতুল আরব’ নামে সাহিত্য গ্রন্থের ক্লাস পড়েছিল। ‘সৌভাগ্য’ এ জন্য বললাম যে, সে সময়ই তিনি উচ্চতম ক্লাসে দাওরায়ে হাদীসের কিতাবাদি পড়াতেন। এমনকি, ইতিপূর্বে আশরাফুল উলুম মাদ্রাসায় নিয়োগের বছরেই রূহানী পিতা মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব হুযূর) (র) তাঁকে মিশকাত শরীফ পড়াতে দেন এবং নিজ হাতে তাঁর মাথায় পাগড়ী পরিয়ে মাদ্রাসা মসজিদে জুমার নামায পড়াতে দেন।

শায়খের মধ্যে আমরা ছাত্রজীবনের শুরুতেই যে বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলাম, তা হল সীমাহীন দরদের সঙ্গে ছাত্রদের গড়ে তোলা। ক্লাস আরম্ভ করার প্রাথমিক পর্যায়েই তিনি আমাদের বলে দিলেন, ‘তোমরা আমার কাসে কিতাব নিয়ে আসবে না, বরং আগামী দিনের ক্লাসে যতটুকু পড়ার সম্ভাবনা ততটুকু খাতায় সুন্দর করে লিখে নিয়ে আসবে।’ উস্তাদের নির্দেশানুসারে আমরা হাতে লিখে খাতা নিয়ে এসে ক্লাস করতে লাগলাম। কাসের শুরুতেই তিনি এক-এক জনের খাতা নিয়ে লেখা দেখতেন এবং সুন্দর নমুনার কিছু না কিছু আরবী লেখা লিখে দিতেন। ফলে, আমার যতদূর মনে পড়ে,& এক বছরের মধ্যে আমাদের প্রায় সকলের হাতের লেখাই সুন্দর হয়ে গেল।

শায়খ (র)-এর আরবী সাহিত্যের ক্লাসে আরেকটি আকর্ষণ ছিল, তাঁর আজীব ঢং-এ আরবী কাব্য পাঠ। তাঁর পড়ার সাথে সাথে আমরা নিঃশব্দে তাঁর কাব্য পাঠের ভঙ্গির অনুকরণ করতাম। তাঁর ক্লাসে গদ্যাংশের এবারত ছাত্ররা নিজ স্বাধীন ভঙ্গিতেই পড়ত, কিন্তু পদ্যাংশ শায়খের আদর্শ ভঙ্গিতেই পড়তে হত। তাঁর কাসে আভিধানিক ও ব্যাকরণগত তাহকীকাত করার গুরুত্ব তো ছিলই। এতে করে স্বল্প দিনেই শায়খের ক্লাসের ছাত্ররা আরবী সাহিত্যে পাকা ও পারদর্শী হয়ে উঠত। ফলে, তারা অপরাপর কিতাবেরও আরবী এবারত নির্ভুলভাবে পড়ার যোগ্যতা হাসিল করে ফেলত।

হযরত শায়খুল হাদীছ (র) এখানেই ক্ষান্ত হতেন না। আরবী ভাষায় ছাত্রদের বক্তৃতা শেখানোরও তাঁর অদম্য প্রচেষ্টা ও কৌশল ছিল। সেকালে আরবীতে বক্তৃতা দিতে পারাটা ছিল একটা দুর্লভ ব্যাপার। তাই তিনি ছাত্রদের উৎসাহিত করে এ ব্যাপারে তাঁর নিজ ছাত্রজীবনের বিশেষ কৌশলের উল্লেখ করে বলতেন, তিনি প্রথম প্রথম খাতায় আরবীতে বক্তৃতা লিখে মুখস্থ করতেন এবং সভায় তা শোনাতেন। শ্রোতাদের মনে হত তিনি উপস্থিত বক্তৃতা দিচ্ছেন। অবশ্য এ ছিল তাঁর ছাত্রজীবনের প্রথম দিকের কৌশল। নতুবা ছাত্রজীবনেরই শেষের দিকে যে ক্ষেত্রে তিনি স্বরচিত কাব্য পাঠ করে বক্তৃতা করতেন, সেক্ষেত্রে আরবী গদ্যে উপস্থিত বক্তৃতা তো মামুলি বিষয় ছিল। প্রসঙ্গত  উল্লেখ্য যে, তিনি লালবাগ মাদ্রাসায় একদিন আমাদের বোখারী শরীফের ক্লাস নিচ্ছিলেন, এমন সময় তদানীন্তন সৌদি রাষ্ট্রদূত মাদ্রাসা পরিদর্শনে এসে হযরত প্রিন্সিপাল সাহেব (র) ও মুফতী আব্দুল মুয়িজ সাহেব (র)কে সাথে নিয়ে দাওরার ক্লাসের সামনে এলেন। আর অমনি শায়খ আরবীতে বোখারীর তকরীর আরম্ভ করে দিলেন। জনাব রাষ্ট্রদূত বারান্দায় দাঁড়িয়ে কতক্ষণ অত্যন্ত আনন্দসহ তাঁর আরবী তকরীর শুনলেন।

ছাত্রদের তরবিয়ত ও চারিত্রিক দিকের প্রতিও তাঁর দৃষ্টি যে কিরূপ ছিল সে সম্বন্ধে একটি ঘটনা বলি, লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়া প্রতিষ্ঠার প্রথম বা দ্বিতীয় বছরের কথা। আমাদের উপরের (সম্ভবত) ‘জালালাইন’ ক্লাসের একজন ছাত্র কোন বিষয়ে সঠিক পক্ষ নেন, আর অন্য সব ছাত্র বিপক্ষ অবলম্বন করেন। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায় যে, একদিন তারা সকলে সেই ছাত্রটির উপর এমন চড়াও হলেন যে, তাদের মধ্যকার একজন সকলের সমর্থনপুষ্ট হয়ে তার গায়ে একটি ঘুষি বা থাপ্পর লাগিয়ে দিল। সম্ভবত ছাত্রটি সবার মারমুখিতার ভয়ে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসলে আমরা মাদ্রাসার সকল ছাত্র শিক্ষক ঘটনাটা জেনে ফেলি।

ব্যস, আর কী। অমনি হযরত শায়খ (র) সকল শিক্ষকের সমন্বয়ে মাদ্রাসা কমিটির মিটিং ডাকলেন। হযরত সদর সাহেব (র) সম্ভবত নিজ দেশের বাড়ীতে ছিলেন। কমিটির সেক্রেটারী জনাব হযরত মাওলানা দীন মুহাম্মাদ খান (র)সহ অনেক সদস্য ও আসাতিযায়ে কেরাম এবং সকল ছাত্রদের উপস্থিতিতে এ সভায় সর্বাগ্রে যিনি বক্তৃতা করলেন তিনি হযরত শায়খুল হাদীছ (র)। আমি অধম এ মুহূর্তে প্রায় ৬০ বছর আগের সে দৃশ্যটি এখনো দেখতে পাচ্ছি। শাহী মসজিদে অনুষ্ঠিত সভায় দাঁড়িয়েই তিনি চিৎকার দিয়ে উঠলেন এবং কান্নারত অবস্থায় অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী তকরীরে বললেন, ‘এ-ই কি জামেয়া কোরআনিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল? আজ এ কি ঘটনা ঘটে গেল? এ তো মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার আদর্শের সর্ম্পূর্ণ পরিপন্থী।’ মোট কথা, তাঁর বক্তৃতায় শ্রোতারা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রভাবিত হলেন। আরো অনেকের তকরীর ও আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় যে, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী উক্ত ঘটনার জন্য সেই একটি মাত্র ছাত্রকে রেখে ক্লাসের আর সকল ছাত্রের নিকট থেকে মাদ্রাসার কিতাবাদি ফেরত ও জমা নিয়ে তাদের বহিষ্কার করা হোক। উক্ত সিদ্ধান্ত তৎক্ষনাৎ কার্যকরী করা হয়। অতপর সেই ছাত্ররা নিজেদের অপরাধ উপলব্ধি করে তওবা করেন এবং কয়েকদিন যাবৎ ঘুরে ঘুরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের হাত পা ধরে অনুরোধ করেন যে, এমন কাজ তারা আর জীবনে কখনো করবেন না। ফলে, তাদের মাদ্রাসায় আবার ভর্তি করা হয়।

বলতে কি, ছাত্রদের তা‘লীম নয় শুধু, তাদের তরবিয়ত করানার্থে হযরত শায়খের ভূমিকা ভোলার নয়। সেদিন শোকে দুঃখে মুহ্যমান হয়ে তাঁর যে সেই কান্না, অধমের স্মৃতি থেকে তা কখনো মুছে যাওয়ার নয়। ছাত্রদের কল্যাণ কামনায় তাঁর এ অবস্থা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী এবং একটি বিরল ঘটনা।

পৃথকভাবেও একেক জন ছাত্রের তরবিয়তের ধারার একটি ঘটনা মনে হল। হযরত শায়খ (র) কর্তৃক ছাত্রদের প্রতি কিরূপ সূক্ষ্মদৃষ্টি ছিল সে সম্বন্ধেই এ ঘটনা। বর্তমানে লালবাগ মাদ্রাসার প্রখ্যাত আলেম, মুহাদ্দিছ ও মুফাসসির মাওলানা আব্দুল হাই সাহেব দা. বা. অধমের নিকট বলেছিলেন, ‘ছাত্র জীবনে একদা আমি স্বল্প বয়সহেতু একটি কিতাব বইয়ের মতো হাতের মুঠিতে হেলাফেলা করে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। তখন হযরত শায়খুল হাদীছ সাহেব আমাকে দেখে সতর্ক করে বললেন, ‘এ কি বই-পুস্তক নাকি যে, এমনভাবে নিয়ে যাচ্ছ?’ মাওলানা গৌরব করে তার মনের কথা প্রকাশ করলেন যে, আল্লাহ তা‘আলার রহমতে তাঁরা তাঁর মতো এমন উস্তাদদের হাতে তা‘লীম ও তরবিয়ত পেয়েছিলেন।

হযরত শায়খ (র)-এর তরবিয়তের ধারার প্রসঙ্গটি এ জন্য দীর্ঘ করছি যে, বর্তমান কালে আমাদের মাদ্রাসাগুলির ছাত্ররা তা উপলব্ধি করুন এবং যথাসম্ভব পিছনের সেই সব যুগের তা‘লীম ও তরবিয়তের অনুসরণ করতে সচেষ্ট হোন। আহ! সে কী যুগ ছিল এবং আমাদের উস্তাদগণের ছাত্রজীবন কী স্বর্ণযুগেই না কেটেছিল। আমরা তখন তাঁদের মুখে শুনতাম যে, দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়ার সময় তাঁরা দেখেছেন, নামাযের জামাতে ছাত্ররা সকলে তকবীরে উলার ফযীলত পাওয়ার জন্য মসজিদের প্রথম সারিগুলিতে স্থান দখল করতেন।

ছাত্রজীবনে শায়খ (র) শুধু আরবী গদ্যেই বক্তৃতা করতেন, তা নয়, বরং তাঁর সাহিত্য প্রতিভার গুণে আরবী পদ্যেও নানা বিষয় রচনা করতে ও বক্তৃতা দিতে শুরু করেন।

জাতীয় মসজিদ বাইতুল মুকাররমের তদানীন্তন খতীব হযরত মাওলানা উবায়দুল হক (র)কে একদা আমি এক অন্তরঙ্গ পরিবেশে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হুযূর, আপনার ও শায়খুল হাদীছ সাহেবের বয়সের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে কি?’ উভয়কে তখন একরকম বয়ষ্ক মনে হত বলে আমার এই প্রশ্ন। হযরত খতীব সাহেব বললেন, ‘তিনি তো বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়। আমি যখন হিন্দুস্থানে (‘শরহেজামী কিতাব’) পড়তে গেলাম, তখন তিনি লেখা-পড়া শেষ করে দেশে ফিরছেন। আমি যেদিন তাঁর উস্তাদ হযরত শায়খুল ইসলাম শাববীর আহমাদ উছমানী (র)-এর মাদ্রাসায় পৌঁছলাম, সেদিনই একটি উলামা মাহফিল হচ্ছিল। মাওলানা আজিজুল হক সাহেব সেই সভায় আরবীতে বক্তৃতা এবং হযরত শায়খুল ইসলামের শানে স্বরচিত একটি কবিতা পাঠ করছিলেন। এতে আমরা অতি আনন্দিত হয়েছিলাম এবং আমরা বাঙ্গালী ছাত্ররা অতি গৌরববোধ করেছিলাম।’

শায়খুল হাদীছ (র) এর স্মরণে করাচির জামেয়া ফারুকিয়ার মুহতামিম শায়খুল হাদীছ মাওলানা সালিমুল্লাহ খান দা. বা. লেখেন, ‘মাওলানা আজিজুল হক সাহেবকে আমি প্রথমবার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে দার”ল উলুম দেওবন্দে সেই সময় দেখেছিলাম, যখন ১৩৬৫ হিজরী মোতাবেক ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে আমি দাওরায়ে হাদীছের ছাত্র ছিলাম এবং তখন দারুল হাদীছের ভেতর একটি সভায় তিনি সাবলীল আরবী ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন। সে যুগে দারুল উলুম দেওবন্দেও আরবী ভাষায় বক্তৃতার চর্চা ছিল না। তাই আমার জানার কৌতূহল হল, এ ছাত্রটি কে, যে অতি নির্বিঘ্নে এত সুন্দর আরবী বলেন। জানতে পারলাম, তিনি (এখানে) দাওরায়ে তফসীরের ছাত্র এবং ঢাকার আশরাফুল উলূম বড় কাটারা থেকে শায়খুল হাদীছ আলামা জফর আহমদ উছমানীর নিকট (প্রথমবার) বোখারী শরীফ পড়ে এসে গত বছর ডাভেলে আল্লামা শাববীর আহমদ উছমানীর নিকট দ্বিতীয়বার সহীহ বোখারী শরীফ পড়েছেন এবং আল্লামা উছমানী সাহেবের তকরীর অতি যত্ন ও গুরুত্বের সাথে লিপিবব্ধ করেছেন। এখন আলামা মরহুম সেই তকরীর দেখে দিচ্ছেন ……।’ (ফযলুল বারী ৩য় খন্ড)

শায়খের কাব্য প্রতিভার উৎকৃষ্ট প্রকাশ ঘটেছিল রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা শরীফের নিকট বসে তাঁর শানে লিখিত ও রওজা পাকের ধারে পঠিত কাসীদা বা কবিতাসমূহে। একদা তিনি মসজিদে নববীতে জামাতের অপেক্ষায় কাতারে বসে একটু হালকা স্বরে সেই ধরনের একটি  কবিতা পাঠ করছিলেন। পাশেই বসেছিলেন এক আরববাসী সুধী ব্যক্তি। তিনি তাঁকে দুচারটা ছন্দ পড়তে শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘শায়খ! তুমি কী পড়ছ?’ তখন তিনি বললেন, ‘হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শানে লিখিত একটি কাসীদার কয়েকটি ছন্দ। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ কার রচিত?’ তখন শায়খকে বাধ্য হয়ে বলতে হল যে, তাঁরই রচনা। এতে তিনি অনুরোধের সুরে বললেন, আবার পড়ে আমাকে শোনান। সে মতো শায়খ (র) স্বরচিত কাসীদাটি সেই আরববাসী সুধী ব্যক্তিকে শোনালেন। এতে তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন, বিশেষত এই ভেবে যে, একজন অনারব ব্যক্তি কী করে এত সুন্দর কাসীদা রচনা করতে পারল? এরপর সেই আরব সুধী ব্যক্তি মদীনা শরীফের একাধিক স্থানে সুধী মাহফিল করে করে শায়খকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যেতেন। এবং তাঁর দ্বারা তাঁর স্বকীয় ভঙ্গিতে তা পড়িয়ে তারা শুনতেন। তার পর থেকে হযরত শায়খ (র) হজ্জের প্রায় প্রতি সফরেই একটি করে কাসীদা লিখতেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা পাকে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে পাঠ করতেন। পাশে দাঁড়ানো আরবী ভাষী বা অন্য ভাষাভাষি আলেম ব্যক্তিরা মোহিত হয়ে যেতেন। হজ্জের সফর শেষে দেশে এসে শায়খ (র) নিজ মাদ্রাসার সকল ছাত্র শিক্ষকের মাহফিলে এসব কাসীদা পড়ে শোনাতেন এবং তারাও অভিভূত হতেন। উল্লেখ্য যে, উক্ত কাসীদাগুলি তাঁর বাংলা বোখারী শরীফে পর পর কয়েক খন্ডের প্রথম ভাগে বরকতের জন্য এবং বাংলা ভাষাভাষীদের উপকারার্থে অর্থসহ তিনি সংযোজন করে দিয়ে গেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। আমীন\

হযরত শায়খুল হাদীছ (র)-এর শিক্ষাদানের পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বলতে হলে বলতে হয়, সাহিত্যের ক্লাসে তাঁর যে রূপ দেখেছিলাম, পরবর্তীকালে যখন তার হাদীছের ক্লাসে বসার সৌভাগ্য হল, তখন দেখতে পেলাম তার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। সাহিত্যে তাঁর স্বভাব সুলভ হাসি ও রসিকতা দরসের পরিবেশকে এমন আনন্দমুখর করে তুলত যে, তাতে করে আমরা সাহিত্যরস উপভোগ করতাম এবং বিষয়টি অতি সহজে বুঝে নিতাম। আর হাদীছের ক্লাসে ছিল তাঁর আদব ও গাম্ভীর্য। হাদীছ শাস্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ কিতাব বোখারী শরীফের অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা হযরত শায়খের জীবনে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রথমে তাঁর বোখারী শরীফের অধ্যাপনার কথাই বলি। আমি অধম দু দিকেরই পড়া-শোনা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ক্লাসে বসেছি এবং স্বনামধন্য প্রফেসর ও পিএইচডি উপাধীধারী শিকদের নিকট পড়েছি। কিন্তু বোখারী শরীফে শায়খের যে কামাল অর্থাৎ পারদর্শীতা ও পারঙ্গমতা উপলব্ধি করেছি, তা আর কোন শিক্ষক বা অধ্যাপকের মধ্যে আমি জীবনে পাইনি। বোখারী শরীফের অধ্যাপনায় তিনি যে শিক্ষাপদ্ধতি অবলম্বন করতেন এবং যে দক্ষতার সাথে পড়াতেন, তা বর্তমান কালে অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়। বিশেষত তিনি বোখারীর এবারতকে পানির মত ‘হল’ করে দিতেন।

উল্লেখ্য যে, বোখারী শরীফের অধ্যাপনায় তাঁর সুখ্যাতির ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের কর্তৃপক্ষের অনুরোধে হযরত শায়খ (র) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েক বছর বোখারীর অধ্যাপনা করেন। আরো উল্লোখ্য যে, শায়খের উস্তাদ হযরত হাফেজ্জী হুযূর (র)-এর জীবদ্দশায় তাঁর স্নেহমাখা নির্দেশে তাঁরই প্রাণপ্রিয় মাদ্রাসা নূরিয়াতে তিনি বহুদিন বোখারীর দরস দিয়েছিলেন। সে দরসে স্বয়ং হযরত হাফেজ্জী হুযূর হযরত শায়েখের পাশে এসে বসতেন। প্রিয় শাগরেদের অনুপম দরসে মুগ্ধ হয়ে কোন সময় বলতেন, ‘মনে চায় মাওলানা আজিজুল হক সাহেবের নিকট সমস্ত বোখারী শরীফ পুনরায় পড়ে নিই।’ সে সময় হযরতের মাদ্রাসার আরো কয়েকজন মুহাদ্দিস শায়খের দরসে বসেছেন এবং বছরব্যাপী ক্লাস করে পুনরায় সনদ হাসিল করেছিলেন। ময়মনসিংহ বড় মসজিদের খতীব ও বড় মসজিদ মাদ্রাসার শায়খুল হাদীছ মাওলানা আব্দুল হক সাহেব ও লালমাটিয়া মাদ্রাসার শায়খুল হাদীছ মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী সাহেব তাদের অন্তর্ভুক্ত।

আমি আলোচনার প্রারম্ভেই শায়খ (র)-এর অসাধারণ মেধা ও কালজয়ী প্রতিভার কথা উল্লেখ করেছি। সেই সঙ্গে হাদীছের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বোখারী শরীফ অধ্যয়নে তাঁর পরম সৌভাগ্যও উল্লেখযোগ্য। উচ্চ শিক্ষার শেষ প্রান্তে এসে তিনি পর পর দু’বছর বিশ্ববরেণ্য দুজন আলেম ও বোখারী শরীফের অদ্বিতীয় উস্তাদের নিকট অধ্যয়ন করার দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেন। এর ফলেই তিনি পরবর্তী কালে বেনজীর ‘শায়খুল হাদীছ’ হতে পেরেছেন। তাদের মধ্যে প্রথম জন হলেন, আলেমকূল শিরোমনি আলামা যফর আহমদ উছমানী (র)। দ্বিতীয়জন হলেন, শায়খুল ইসলাম আলামা শাববীর আহমাদ উছমানী (র)।

বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ উস্তাদ যখন তাঁর যথার্থ এলেম বোঝার মত যোগ্য শাগরেদ পান, তখন অত্যন্ত উৎসাহের সথে ও অতি আনন্দচিত্তে তার গভীর ইলমী পাঠদানের কাজটি  করে থাকেন। শায়খুল হাদীছ (র) যখন বঙ্গদেশ থেকে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে সুদূর বোম্বাইয়ের ডাভেলে গিয়ে হাদীছের ইলমের সাগর স্বনামধন্য উস্তাদ হযরত শায়খুল ইসলামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে তাঁর পরিচয় দিলেন এবং আগের বছর যে ঢাকায় আল্লামা জফর আহমাদ সাহেবের নিকট প্রথম বার বোখারী শরীফ পড়েছেন বলে জানালেন, তখন শায়খুল ইলাম (র) দূর দৃষ্টির আলোকে বললেন, ‘আমি বিগত দশ বছর যাবৎ বোখারী শরীফ পড়াচ্ছি। মনে হয় এ বছরেই বোখারী আমার শেষ পড়ানো হবে। তুমি এসেছ, ভালোই হল। আমি আশা করছি, বিগত দশ বছরের সমষ্টি এ বছর পড়াব।’

বাংলাদেশের আলেমকূল শিরোমণি মুরশেদে রাববানী মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (র) শায়খের অনূদিত ও বিশদ ব্যাখ্যাসম্বলিত বাংলা বোখারী শরীফের মুখবন্ধে লিখে দিয়েছেন, ‘যতদূর আমার জানা আছে, বোখারী শরীফ বর্তমান যুগে বাংলাদেশে তাঁর চেয়ে অধিক যত্ন সহকারে এবং আদ্যোপান্ত বুঝে আর কেউ পড়েননি। (কেননা হযরত শায়খুল ইসলাম (র) দৈনিক ৪/৫ ঘন্টা করে সমগ্র বোখারী শরীফ অর্থাৎ ৩০ পারাই পড়িয়েছিলেন- প্রবন্ধকার নিজে হযরত শায়েখ (র)-এর নিকট শুনেছিল) এবং বোখারী শরীফের খেদমতও এতদূর কেউ করেননি। তিনি হযরত শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাববীর আহমাদ উছমানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির খাছুলখাছ শাগরেদ। পড়ার জামানাতেই তিনি ১৮০০ পৃষ্ঠাব্যাপী শরাহ উর্দূ ভাষায় লিখেছেন। (ফজলুল বারীর দিকে ইশারা, যা হযরত শায়খুল ইসলামের দরসী তাকরীরসমূহের সংকলন।) স্বয়ং হযরত শায়খুল ইসলাম তার লেখা সঙ্গে সঙ্গে আদ্যোপান্ত দেখেছেন, আনন্দিত হয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন।’ বলাবাহুল্য, শায়খের জন্য এর চেয়ে বড় সার্টিফিকেট আর কিছু হতে পারে না।

‘শায়খুল হাদীছ’ হিসাবে বর্তমানকালে গোটা উপমহাদেশে তাঁর কোন জুড়ি নেই। পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানের প্রখ্যাত আলেমগণ শায়খের অধ্যয়নকালের সৌভাগ্য এবং পরবর্তী কালে তাঁর বোখারী শরীফের অনুপম অধ্যাপনা এবং বাংলা ভাষায় উক্ত হাদীছ গ্রন্থের অতুলনীয় অনুবাদ ও ব্যাখ্যার জন্য সর্বমহলে তাঁর খ্যাতির কথা জানেন। তাঁর বাংলা বোখারীর সর্বশেষ এডিশন হিসাবে ইতিপূর্বে ৭ খন্ডে সমাপ্ত ও প্রকাশিত গ্রন্থ ছাত্র শিক্ষকের পড়া ও পড়ানোর উপযোগী করে ১০ খন্ডে ছাপিয়ে প্রকাশ করে গেছেন। পাঠকবর্গের নিকট অনুরোধ, তারা যেন আল্লাহ রাববুল আলামীনের দরবারে দোআ করেন, তিনি তাঁর হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিবেদিতপ্রাণ এই খাদেমকে লেখার মাধ্যমেও বোখারী শরীফের খেদমত পূর্ণতায় পৌছিয়ে দিয়ে যেতে পারার জন্য অফুরন্ত প্রতিদান দেন। বলাবাহুল্য, এ উপমহাদেশের প্রধান দুটি ভাষা বাংলা ও উর্দূতে শায়খের উপরোল্লিখিত খেদমত দুটি ইনশাআলাহুল আযীয কিয়ামতকাল পর্যন্ত তাঁর নেক নামী (সুনাম) এর নিদর্শন হয়ে থাকবে এবং তিনি পরকালের অনন্ত জীবনে এর অফুরন্ত সুফল ভোগ করতে থাকবেন।

প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ্য যে, শায়খের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা ছিল বোখারী শরীফের বাংলা ও উর্দূ শরাহ দুটির সমন্বিত খেদমত বিশ্ব মুসলিমের প্রাণ প্রিয় কুরআনী ভাষা অর্থাৎ আরবীতেও অনূদিত হয়ে প্রকাশ হোক। ফলে, আরব অনারব তথা বিশ্ব মুসলিম এই অদ্বিতীয় খেদমতের দ্বারা উপকৃত হতে থাকবেন। সুখের বিষয় এ লক্ষ্যে তিনি তার আওলাদদের মধ্য থেকে তাঁর সুযোগ্য ইলমী ওয়ারেছ তৈরী করে গেছেন। শায়খ (র)-এর বড় মেয়ের ঘরের নাতি মারকাযুদ্দাওয়াতিল ইসলামিয়ার এলমে হাদীছের খাদেম মাওলানা সাঈদ আহমাদ ‘ফযলুল বারী’ নামে বোখারী শরীফের যে উর্দূ শরাহ করাচী থেকে ইতিপূর্বে বের হয়েছিল, তার তৃতীয় খন্ড হিসাবে শায়খের জীবদ্দশায় এই নামেই কিতাবী আকৃতি দান করেছেন। বর্তমানে কিতাবটি চক বাজার রশীদিয়া লাইব্রেরীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ইনশাআল্লাহ অচিরেই তা ঢাকা ও দেশের বড় বড় লাইব্রেরীতে পাওয়া যাবে। আল্লাহ তা‘আলার কাছে আমাদের প্রার্থনা, তিনি উর্দূ শরার অবশিষ্ট কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি প্রকাশ করার তাওফীক তাকে দান করবেন। তারপর ইনশাআল্লাহ আরবী সংস্করণ প্রকাশের কাজে হাত দেওয়া হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাও পরিপূর্ণতায় পৌছিয়ে দিন। আমীন।

শায়খুল হাদীছ (র) থেকে বোখারী শরীফের সনদ এক দুর্লভ রত্ন হিসাবে পরিগণিত। তার ওয়াফাতের পূর্বে বেশ কয়েক বছর ধরে সমস্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে হযরত শায়খের নিকট বোখারী শরীফ পড়ার জন্য এবং তাঁর থেকে এ কিতাবের সনদ হাসিল করার জন্য উচ্চতর ক্লাসের ছাত্ররা দলে দলে বছরের শুরুতে ঢাকায় এসে তাঁর দরবারে হাজির হতেন। কিন্তু শায়খের মাদ্রাসা জামিয়া রাহমানিয়াতে এত ছাত্রের স্থান সংকুলান হত না বলে তিনি আশে পাশের মাদ্রাসায় তাদের ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। ছাত্রদের দুর্বার আগ্রহ ও সে সব মাদ্রাসা কতৃপক্ষের আকূল আবদারে তিনি সে সকল মাদ্রাসা যথা, লালমাটিয়া মাদ্রাসা, দারুস সালাম মাদ্রাসা ও মিরপুর জামেউল উলুম মাদ্রাসায় বৃদ্ধ বয়সেও বোখারীর দরস দিতে যেতেন। ইতিপূর্বে বলা হয়েছে, লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়ায় বোখারী শরীফ পড়ানোর সময় মাদ্রাসা নূরিয়াতেও তিনি বোখারী পড়িয়েছিলেন। এতে করে শায়খের নিকট থেকে প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ শত ছাত্র বোখারী শরীফের সনদ নিচ্ছিলেন। এলমে দীনের ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ হিসাবে হযরত শায়খুল হাদীছ আল্লামা আজিজুল হক কর্তৃক প্রদত্ত বোখারী শরীফের স্বর্ণ সনদের কোন জুড়িই ছিল না।

ছাত্রজীবনে হযরত শায়খ (র) এর সাধনা ও পরিশ্রম ছিল অবিস্মরণীয়। তাঁর অসাধারণ পরিশ্রম ও সাধনা সম্বন্ধে জানাতে গিয়ে নিজেই বলেছিলেন, তিনি তখন মাত্র ৩/৪ ঘন্টা ঘুমাতেন। ফলে যখন লেখা-পড়া থেকে ফারেগ হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন তাঁর মনে হত, তাঁর মাথার মগজ যেন অকেজো হয়ে গেছে। কিন্তু তিনি প্রায় দেড় যুগের অক্লান্ত অবিশ্রান্ত সাধনায় যা হাসিল করেছিলেন, তা দেশের মানুষের খেদমতে বিলানোর বুকভারা আশায় অস্থির হয়ে তার এক হাকীম বন্ধুর শরনাপন্ন হন। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞ ও খ্যাতনামা চিকিৎসক ছিলেন। তিনি স্বীয় গবেষণা ও অভিজ্ঞতালব্ধ বহু মূল্যবান ধাতব উপাদানে বিশেষভাবে তৈরী ঔষধ তার প্রিয় বন্ধুকে দিতে থাকেন এবং সেই সাথে উত্তম মানের পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেন। আমরা জানি, হাকীম সাহেবের প্রদত্ত ঔষধ ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের নিয়ম তিনি সারা জীবন মেনে চলেছিলেন। ফলে তিনি আজীবন সুস্থ থেকেছেন। এবং দীনের ও দীনী এলমের খেদমত করতে পেরেছেন। ওয়াফাতের দু’বছর পূর্ব থেকে বার্ধক্যজনিত অসুস’তায় শয্যাশায়ী হন এবং সম্বিত হারানোর পরও আম”ত্যু তার পবিত্র মুখে সর্বদা ইসমে জাত ও পবিত্র কলেমার যিকির জারী ছিল।

উস্তাদদের খেদমতে হযরত শায়খ (র) ছিলেন অতুলনীয়। আল্লাহ তা‘আলা শায়খকে অসাধারণ মেধা ও প্রজ্ঞা দানের সাথে সাথে তিনি তাঁকে দেশ-বিদেশের অসামান্য যোগ্যতা ও তাকওয়া সম্পন্ন উস্তাদবৃন্দ লাভের সৌভাগ্য দান করেছিলেন। সমস্ত ছাত্রজীবনব্যাপী তিনি তাদের থেকে ইলমে দীন হাসিল করতেন এবং সেই সাথে মনে প্রাণে তাঁদের খেদমতও করতেন। লেখা-পড়ার সময় বাদে প্রায় সারা বছর তিনি উস্তাদদের খেদমতে নিবেদিত থাকতেন। এক দিকে ছাত্র হিসাবে হযরত শায়খ ছিলেন সকল গুণের অধিকারী, অপরদিকে সমকালে শ্রেষ্ঠ উস্তাদবৃন্দের তা‘লীম তরবিয়ত এবং তাঁদের আন্তরিক দো‘য়া যেন তাঁর জন্য সোনায় সোহাগারূপে প্রমাণিত হয়েছিল। এমন উস্তাদবৃন্দের সোনালী পরশে শায়খের রং-ই বদলে গিয়েছিল। দেশে তাঁদের মধ্যে তাঁর প্রধান উস্তাদ ছিলেন আলামা যফর আহমাদ উছমানী (র)। তারপর যখন তিনি দ্বিতীয়বার বোখারী শরীফ পড়ার জন্য বঙ্গদেশ থেকে সুদূর বোম্বাইয়ের নিকটবর্তী ডাভেলস্থ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় তাঁর সর্বশেষ উস্তাদ শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাববীর আহমাদ উছমানীর নিকট পড়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন এক সময় আল্লামা জফর আহমাদ উছমানীর সঙ্গে সাক্ষাতে হযরত শায়খুল ইসলাম কথায় কথায় বলেছিলেন, ‘মিয়া আজিজুল হকের মধ্যে যেন আপনার রং দেখা যায় বলে মনে হয়।’ সে বছর ডাভেলে এবং পরের বছর দেওবন্দে অবস্থান কালে তিনি তাঁর এ উস্তাদদেরও অনেক খেদমত করেছিলেন এবং রূহানী তরবিয়ত হাসিল করেছিলেন।

অতএব শায়খের পুরো ছাত্রজীবনই নিবেদিত ছিল লেখা-পড়ার সাধনায় ও উস্তাদবৃন্দের খেদমতে। এরই ফলে ছাত্র থাকাবস্থায়ই শায়খের নানামুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটতে থাকে। সে সবের মাঝে পবিত্র হাদীছ শাস্ত্রে ও আরবী সাহিত্যে তাঁর কাব্যিক প্রতিভার বিকাশ সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর আরবী সাহিত্য চর্চা শিক্ষকতার জীবনে এসে ফলে ফুলে উদ্ভাসিত হয়।

১০

হযরত শায়খুল হাদীছ (র) ছিলেন উস্তাদদের নয়নমণি। প্রসঙ্গত মনে হল, হযরত শায়খ (র) তাঁর মহান উস্তাদদের নিকট যে কত প্রিয় ছিলেন, এ সম্বন্ধে তাঁরই পরম আত্মীয় (অর্থাৎ আম্মার ছোট ভাই) মাওলানা মুহাম্মাদ আমীনুল ইসলাম (র)-এর মুখে বর্ণিত একটি ঘটনা: স্বয়ং হযরত আল্লামা জফর আহমাদ উছমানী (র) নিজে তাঁর প্রাণ প্রিয় ছাত্র অর্থাৎ শায়খের বিয়ের পয়গাম পাঠাতে গিয়ে মাওলানার শ্রদ্ধেয় পিতাকে লিখেছিলেন, ‘মিয়া আজিজুল হক আমার ছেলে। হাজার মানুষের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ।’ হযরত শায়খুল ইসলাম মাওলানা শাববীর আহমাদ (র) স্বীয় শাগরেদ হযরত শায়খকে একটি ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়েছিলেন : আমার আশা যে, তোমার দ্বারা বঙ্গ দেশে আমার কিছু কথা প্রসারিত হবে।’ আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহ তাআলা তার এই আশাকে কিভাবে অরে অরে বাস্তবায়ন করেছেন।

১১

আরবী সাহিত্যে তাঁর কৃতিত্ব ও এলমে হাদীছে তাঁর অসামান্য দক্ষতা ও পারদর্শিতার বিষয় আরজ করার পর এলমে তফসীরেও যে তাঁর অসামান্য দক্ষতা ছিল, সে কথা কিছু না বললে তাঁর এলমী আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায় বলে মনে করি।

হযরত শায়খ (র) বলেছিলেন, তিনি যখন ছাত্র, তখনকার সময়ে ক্লাসে কুরআন শরীফের তরজমা পড়ানো হত না, সরাসরি আরবী তফসীর পড়ানো হত। তাই তিনি কালামে পাক উত্তমরূপে বোঝার জন্য তফসীর পড়ার পূর্ববর্তী বছর কয়েকজন মেধাবী ছাত্রের সমন্বয়ে ‘বয়ানুল কুরআন’ ও ‘ফাওয়ায়েদে উছমানী’-এর অনুসরণে কুরআনের তরজমা আয়ত্ত করে ফেলেন। এতে দাওরায়ে হাদীছেরও কিছু ছাত্র এসে শামিল হতেন। আরো একটি আশ্চর্যের কথা এই শুনেছি যে, আরবী সাহিত্যের বিখ্যাত কিতাব ‘মাকামাতে হারীরী’ পড়ার বছর এ কিতাবের কোন কোন শব্দ কুরআন শরীফের কোথায় কোথায় আছে তা অকান্ত পরিশ্রমসহ খুঁজে খুঁজে বের করেন, যাতে আল্লাহ তা‘আলার কালামের মর্মার্থ উত্তররূপে বুঝতে পারেন এবং দলীলরূপে উক্ত কিতাবের শরাহতে দেখাতে পারেন।

তিনি ছাত্রাবস্থাতেই ‘মাকামাতে হারীরীর’ মত সাহিত্যের অত্যন্ত কঠিন কিতাবের উর্দূ শরাহ (বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ) লিখে ফেলেন, যা পরবর্তী কালে সাহিত্যের শিক্ষকগণ অত্যন্ত যত্নসহ পড়তেন। এবং সে অনুযায়ী কৃতিত্বের সাথে সেই কিতাবখানি ছাত্রদের পড়াতেন। এ ছাড়া ছাত্রজীবনে তিনি আরো কোনো কোনো কঠিন কিতাব এমনকি হাদীছ গ্রন্থেরও শরাহ লিখেছিলেন। যেগুলি পরবর্তী কালে

উস্তাদদের জন্য বিরাট সহায়ক হিসাবে প্রমাণিত হয়। ক্লাসে উস্তাদদের তাকরীর (ব্যাখ্যা বক্তব্য) ছাড়াও প্রত্যেক কিতাবের যত শরাহ পাওয়া যেত, সেগুলিও তিনি সংগ্রহ করে পড়তেন। অতপর তাঁর অসাধারণ মেধা ও প্রজ্ঞাবলে প্রত্যেক বিষয়ে বড় কিতাবের আজীব ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যাখ্যা লিখতেন।

একদা তিনি বলেন, ‘মানতিক বা দর্শন শাস্ত্রের কিতাব ‘সুল্লাম’ পরীক্ষায় মূল তিনিটি প্রশ্নের একটির উত্তর লিখে সেরেছি তখন পরীক্ষার সময় (৩ ঘন্টা) শেষ হয়ে গেছে। এবং জোহরের নামাযের আযানও হয়ে গেছে। আমি উস্তাদদের এ কথা বিনীতভাবে জানালে পর হযরত সদর সাহেব হুযূর তা অবগত হলেন। হুযূর অতি শফকত ও মুহাববতের সঙ্গে বললেন, ‘আচ্ছা আজিজুল হকের অবশিষ্ট পরীক্ষার গার্ড আমিই দেব। বাদ জোহর হুযূর যথাস্থানে বসে থাকলেন আর আমি লিখতে থাকলাম। এমন সময় আছরেরও আযান হয়ে গেল, এমনিভাবে আছরের পরেও লিখলাম। অথচ আমার উত্তর লেখা তখনো শেষ হয়নি। কিন্তু হুযূর এতেও অধৈর্য হননি, বরং বললেন, ‘ঠিক আছে বাদ মাগরিব আমার নিকট বসে উত্তর লিখে পরীক্ষা শেষ করবে।’ ঠিক তাই হল। আমার মনে আছে বাদ মাগরিব হুযূর তাঁর স্থানে এসে আওয়াবীন পড়তে থাকলেন এবং তিনটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর লিখে এশার নামাযের পূর্বে খাতা জমা দিলাম। সদর সাহেব হুযূর আমার খাতা খুশিচিত্তে জমা নিলেন। সুহৃদ পাঠক! এমন বিরল ঘটনার কথা কোথাও কখনো শুনেছেন কি?’

শায়খ (র)-এর বোখারীর উর্দূ শরাহ ফজলুল বারী-এর ৩য় খন্ডের মুখবন্ধে বর্তমানে পাকিস্তানের সর্বশ্রেষ্ঠ আলেম মাওলানা তাকী উছমানী দা. বা. হযরত শায়খকে বাংলাদেশের ‘শায়খুল কুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

একদা ঢাকার খাজে দেওয়ান মসজিদে একজন আলেম কর্তৃক কয়েক বছরে পবিত্র কুরআনের তফসীর শেষ হলে মসজিদের বাইরে প্রশস্ত ও দীর্ঘ রাস্তায় সামিয়ানা টানিয়ে শেষ সূরাদুখানির তফসীর ও খতমে কুরআনের দো‘য়ার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। হযরত হাফেজ্জী হুযূর (র)-এর সভাপতিত্বে হযরত শায়খুল হাদীছ (র) সূরা দুখানি অর্থাৎ সূরা নাস ও সূরা ফালাক এর তফসীর করতে থাকলেন ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে। তারপর হযরত হাফেজ্জী হুযূরের প্রশংসা করে শ্রোতাদের সম্বোধন করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘এভাবে এ দু‘টি সূরার ব্যাখ্যা ও তফসীর আমি ইনশাআল্লাহ রাতভর করতে পারব। এ থেকে বুঝুন আমার ও আপনাদের সামনে বসা হযরতের ন্যায় উস্তাদদের কুরআন পাকের এলেম কেমন হতে পারে।’ দীন হীনের অতি বড় সৌভাগ্য যে, অধমও মাহফিলে শ্রোতা হিসাবে উপস্থিত ছিল।

১২

শাইখুল হাদীস (র.)-এর উল্লেখিত দুজন কালজয়ী উস্তাদই সুলুক ও তাসাউফের লাইনে হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিলাত হযরত মাওলানা আরশাফ আলী থানভী রাহ.-এর হাতে তরবিয়তপ্রাপ্ত। আলামা জফর আহমাদ উছমানী রাহ. ছিলেন হযরত থানভী সাহেবের ভাগনে ও অনেক কিতাবের ছাত্র। আর আল্লামা শাববীর আহমাদ উছমানী র. ছিলেন হযরতের রুহানী

সন্তান তথা বায়াত দানের এজাযত প্রাপ্ত খলীফা। এ থেকে হযরত শাইখুল হাদীস (র.) এর জীবনের আরেকটি বিশেষ দিক অর্থাৎ সুলুক ও তাসাউফের লাইনে তাকমীলে এছলাহ বা আত্মসংশোধনের পূর্ণতা প্রাপ্তির সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আল্লাহ তা‘আলার একটি নিয়ম রয়েছে যে, তিনি তার যে বান্দাকে দিয়ে পরবর্তীকালে উম্মতের ইলমী ও দীনী খেদমত নেবেন, বাল্যকাল থেকেই তার তা‘লীম ও তরবিয়তের যথাযথ ব্যবস্থা তিনি নিজ কুদরতে করে থাকেন। হযরত শায়েখের জীবনেও আমরা আল্লাহ তা‘আলার সে নিয়মের বাস্তবায়ন দেখতে পাই। বাল্যকালে ৭/৮ বছর বয়স থেকে তার লেখা-পড়ার দায়িত্ব এমন তিন মনীষীর মুবারক হাতে এসে পড়েছিল, যারা হযরত হাকীমুল উম্মত হযরত থানভীর দরবারে এছলাহে নফস ও এছলাহে আমলে পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। উক্ত তিন মহা মনীষী হচ্ছেন, ১. হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী র. ২. হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুলাহ হাফেজ্জী হুজুর (র.) ৩. হযরত মাওলানা পিরজী হুজুর (র.)। হিন্দুস্থানে ব্যয়িত দু’বছর বাদে শায়েখের সমস্ত ছাত্র জীবন এই তিন যুগশ্রেষ্ঠ ওলীর সান্নিধ্যে ও সুহবতে এবং তা‘লীম ও তরবিয়তে কেটেছিল।

তাঁদের মধ্যে প্রথম দু’জনের তরবিয়ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত শায়খ (র)-এর কথায়, ‘আমার রুহানী ও ইলমী পিতা মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (র.) আমার আট বছর বয়স থেকে তার শেষ জীবন পর্যন্ত ৪০ বছরের অধিক কাল আমাকে সবরকম ফয়েজ-বরকত দানে ধন্য করেছেন।’ হযরত সদর সাহেব বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি পরকালে আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন- শামছুল হক! তুমি আমার সামনে পেশ করার মত কী নিয়ে এসেছ?’ তখন আমি মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ ও মাওলানা আজিজুল হককে পেশ করে দিয়ে বলব- ‘আয় আল্লাহ! আমি তোমার জন্য এদের দু’জনকে নিয়ে এসেছি।’

শায়খ (র)-এর সর্বশেষ উস্তাদ আল্লামা শাববীর আহমাদ সাহেবের নিকটও তাঁর রুহানী তরবিয়ত হয়েছিল। সে সম্পর্কে হযরত সদর সাহেব লিখেছেন, ‘বোখারী শরীফ পড়ার পরও তিনি প্রায় এক বছর হযরত শায়খুল ইসলামের খেদমতে এছলাহে নফস ও তাযকিয়ায়ে বাতেনের কাজে লিপ্ত ছিলেন এবং বোখারী শরীফের শরাহ লিখে তাকে দেখিয়েছেন।’

তদুপরি বোখারী শরীফ তরজমা কালে শায়েখের রুহানী শক্তি বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে হযরত সদর সাহেব যেভাবে দু’আ করেছেন, সে সম্পর্কে হযরত নিজেই লেখেন, ‘অতপর কয়েকবার বোখারী শরীফ ও অন্যান্য সিহাহ সিত্তা হাদীসের কিতাব দরস দেওয়ার পর যখন বাংলাদেশের অভাব মিটানোর জন্য বোখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ করা তিনি শুরু করেন, তখন আমার খুশির আর সীমা রয়নি। আলাহর শোকর করেছি, মক্কা শরীফে গিয়ে হাতীমে, মাতাফে, মাকামে ইবরাহীমে দু’আ করেছি, মদীনা শরীফে রওজা পাকে দাঁড়িয়ে দু’আ করেছি- এই বিরাট খেদমত আলাহ পাক তার দ্বারা নিন, বাংলার মোসলমানদের জরুরত মিটান।’

অনুরূপ, দ্বিতীয় যে রূহানী ব্যক্তিত্বের আজীবন সাহচর্য পেয়ে হযরত শায়খ ধন্য হয়েছেন তিনি হলেন হযরত হাফেজ্জী হুযূর রহমতুল্লাহি আলাইহি সুলুক ও তাসাওউফের লাইনে এদেশে সর্বাপেক্ষা খ্যতিমান এই যুগশ্রেষ্ঠ ওলী হযরত শায়খকে প্রাণ দিয়ে পুত্রবৎ ভালবাসতেন।

হযরত সদর সাহেব হুজুর (র) ও হযরত হাফেজ্জী হুজুর (র)-এর ন্যায় শায়খে কামেলের ৪০/৫০ বছরের সুহবত পাওয়া হযরত শায়খের জন্য এক পরম বিরল সৌভাগ্য। যুগশ্রেষ্ঠ এই উভয় ওলীর রুহানিয়্যাতের সমুদ্রে শতাব্দীরও বেশি কাল যাবৎ অবগাহন করে শায়খের রুহানিয়্যাত যেন তাঁর তবিয়ত বা স্বভাবে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

পল্টন ময়দানে স্টেডিয়াম হওয়ার পূর্বে সেখানে ঢাকার সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত হত। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সহ ভিআইপিরা সে মাঠে নামায পড়ত যখন রাষ্ট্রীয় উচ্চ মহল থেকে হযরত শায়েখের নিকট অনুরোধ এল উক্ত ঈদের মাঠে নামায পড়ানোর জন্য, তখন তিনি বিনয়ের সঙ্গে না করে দিলেন কিন্তু এতে সে মহল থেকে পুনরায় লোক এসে তাকে এমন ধরাই ধরেছিল যে, তিনি তখন আর রাজি না হয়ে পারেননি। এবং তিনি নামাযও পড়ালেন। অধম শাগরেদও সঙ্গে ছিল। নামাযের পরেই তৎকালীন রেডিও ও টিভির জনৈক কারী সাহেব আমাকে আলাদা পেয়ে হাত চেপে ধরে বলে উঠলেন, ‘হুজুর আজ কী চমৎকার নামাযই না পড়ালেন।’ আমরা অবাক হচ্ছিলাম এই ভেবে যে, এমন একটি মহা মর্যাদার রাষ্ট্রীয় প্রস্তাব বা অনুরোধ কি জন্য তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন? পরবর্তী সময়ে হযরত শায়েখ (র)কে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেছিলেন, ‘এ ধরণের ব্যাপারে নিজের মধ্যে একটা অহমিকার ভাব আসতে পারত বলে আমি এড়ানোর চেষ্টা করেছি।’ কিন্তু আমরা জানি তিনি ‘অহম’ কে এমন করেই মিটিয়েছিলেন যে, এতে তার ভাবে কোন পরিবর্তনই আসেনি। ফলে তিনি সে মাঠে বহু বছর নামায পড়িয়েছিলেন।

১৩

আলেমে দীন হওয়ায় হযরত শায়খ (র) তাঁর স্নেহময় উস্তাদ ও রূহানী পিতা হযরত সদর সাহেব (র) এর ন্যায় কি যে গৌরব বোধ করতেন এবং আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করতেন, তা বলে শেষ করার নয়। হাদীছ উল্লেখ করে হযরত শায়খকে বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ তা‘আলা সকল মানুষেরই খায়েরখাহী করে থাকেন। কিন্তু তিনি যাকে আলেম বানিয়েছেন, বুঝতে হবে তিনি তার খায়েরখাহী বিশেষভাবে করেছেন।’ আর একখানি হাদীছ দ্বারা উল্লেখিত হাদীছের ব্যাখ্যায় শায়খ বলতেন, ‘একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এস্তেঞ্জোয় গেলেন। সেখানে তখন পানি পাওয়ার তেমন সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু উঠে বের হয়ে কাছেই একটি লোটায় পানি পেয়ে ব্যবহার করলেন। এতে হুযূর খুব খুশি হয়ে জানতে চাইলেন, কে পানি দিল? চেয়ে দেখেন, অদূরে (খুব কম বয়স্ক) ইবনে আববাস (রা) দাঁড়িয়ে। আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি পানি রেখেছিলাম। তখন হযূরে পাক তার জন্য দো‘য়া করলেন:

اللهم علمه الكتاب وفقهه في الدين

হে আল্লাহ! তাকে কুরআন শিক্ষা দিন ও দীনের বুঝ দান করুন।

অতপর হযরত শায়খ বলেন, ‘এ হাদীছখানি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, দুনিয়াতে এলমে দীনের চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই। কেননা, মানুষ নিজ বংশীয় ছেলের সুখ-শান্তির জন্য সাধারণত পার্থিব ধন-সম্পদের দো‘য়াই করে থাকে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচাতো ভাইয়ের জন্য কুরআন বোঝার ও দীনের গভীর এলেম হাসিলের দো‘য়া করলেন। আর এ দো‘য়ার ফলেই পরবর্তীকালে হযরত ইবনে আববাস (রা) উম্মতের মধ্যে ‘রঈসুল মুফাসসিরীন’ ও ‘ফকীহ’ হিসাবে পরিণত হন।

প্রসঙ্গত অধম আরজ করছে, পরিপক্ক এলেম হাসিলের পর অর্থাৎ যোগ্য আলেম হতে পারাই যদি দীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্য যথেষ্ট না হবে, তবে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ বংশীয় ছেলের জন্য এলেমের জন্য দো‘য়ার পাশাপাশি পার্থিব ধন-দৌলতের জন্যও দো‘য়া করতেন। হযরত শায়খের রূহানী পিতা হযরত সদর সাহেব (র)-এর লিখিত কিতাবে পড়েছি, কোন ব্যক্তি যদি এখলাছের সাথে সাধনা করে এলমে দীন হাসিল করে এবং পরবর্তী জীবনে এখলাছের সাথে এলমে দীনের খেদমতে নিবেদিত প্রাণে নিজেকে নিয়োজিত করে, তবে আল্লাহ তা‘আলা তার দুনিয়ার প্রয়োজনাদি অবশ্যই মিটিয়ে দিবেন। ফলে তিনি দীন ও দুনিয়া উভয় দিক দিয়ে প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদার জীবন যাপন করবেন।

হযরত শায়খুল হাদীছ (র) এলমে দীনকে দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ মনে করতেন। এ শিক্ষা ও প্রত্যয় তিনি যোগ্য উত্তরসূরী হিসাবে নিজ রূহানী পিতা হযরত সদর সাহেব হুযূর থেকে লাভ করেছিলেন, যিনি পবিত্র কুরআন-হাদীছের আলোকে একমাত্র আলাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য পরম বিনয়ী ছিলেন বটে, কিন্তু দুনিয়াদারদের সামনে এলমে দীনের মর্যাদা প্রকাশের উদ্দেশ্যে আলেম হিসাবে নিজের গৌরব (বা ংঁঢ়বৎরড়ৎরঃু পড়সঢ়ষবী) প্রকাশ করতেন। আমাদের সামনেও তাঁকে এলমে দীনের আলোচনা করতে দেখতাম, বুকখানা যেন তাঁর ফুলে উঠেছে। সেই সাথে এ কথাও বলতেন, ‘দুনিয়াদারদের আর কী ধন-সম্পদ আছে। আমার তো মনে হয় যেন আমি সাত রাজার ধনের চেয়েও বড় ধন অর্জন করেছি।’

হযরত সদর সাহেব হুযূরের রূহানী সন্তান শায়খুল হাদীছ (র)&-এর নিকটও এলমে দীনের মর্যাদা এমনই ছিল। তিনি এ কথাও প্রায়ই  বলে থাকতেন, ‘যে ব্যক্তি নিজে আলেম কিন্তু নিজ ছেলেদের এলমে দীন না শিখিয়ে স্কুল কলেজে পড়ায়- তার ভাবটা যেন এরকম, নিজে ঠকেছি তো ঠকেছিই, কিন্তু ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে ঠকাতে চাই না।’ এমন ব্যক্তিকে বলা হয় ‘ফাসিদুল আকীদা’ (তার আকীদার মধ্যে ফাসাদ বা বিপর্যয় রয়েছে) এর পর আমাদের ওসিয়ত করেন যে, এমন আলেমের সঙ্গে আত্মীয়তা করবে না- তার মেয়েকেও বিয়ে করাবে না এবং তার ছেলের নিকটও বিয়ে দেবে না। বরং তার চেয়ে হাজার গুণে ভাল সেই ব্যক্তি, যে আধুনিক শিক্ষিত বা দুনিয়াদার মানুষ এবং ছেলে মেয়েকেও আধুনিক লাইনে লেখা-পড়া করিয়ে ফেলেছে, কিন্তু তারা সকলে দীনদার এবং এলমে দীনের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা রাখে। ছেলে আধুনিক শিক্ষিত কিন্তু সুন্নতী সুরত ও সীরত বিশিষ্ট, আর মেয়েও স্কুল কলেজে পড়ুয়া, কিন্তু সাবালিকা হওয়ার পর থেকে পর্দানশীলা, শরঈ পর্দা পালন করে, সহশিক্ষায় যায়নি, বরং মেয়েদের স্কুলে ও কলেজে পড়েছে। হযরত শায়খ বলেন, এমতাবস্থায় তাদের ছেলেকে যদি আলেম পরিবারের মেয়ে বিয়ে করাতে চায় এবং মেয়েকে আগ্রহের সঙ্গে আলেম পরিবারে (আলেম ছেলের নিকট) বিয়ে দিতে চায়, তবে তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে বাধা নেই।

১৪

হযরত শায়খুল হাদীস (র)-এর গোটা পরিবার সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে সে এক আশ্চর্যকর ইতিহাসের পাতা উল্টানোর মতো। তার দুই পরিবারের গর্ভজাত মোট ৫ ছেলে ও ৮ মেয়ে। প্রথম আম্মার ওফাতের পর দ্বিতীয় আম্মাকে সংসারে পরিবারভুক্ত করেন। প্রথম আম্মার পরিচয় হলো, তিনি ছিলেন প্রখ্যাত আলেম, তাফসীরকার, গ্রন্থকার ও বাগ্নী হযরত মাওলানা মোহাম্মাদ আমিনুল ইসলাম সাহেবের বড় বোন। তারা কুমিলার এক অতি সভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। হযরত আলামা জফর আহমদ উছমানী সাহেব (র.) তার এই সুযোগ্য শাগরেদ হযরত শায়খের প্রতি এতই স্নেহময় ছিলেন যে, তাঁকে নিজের ছেলের মতো করে ঢাকা থেকে কুমিল্লার সফরের কষ্ট গ্রহণ করে শায়খের শ্বশুরালয়ে তাশরীফ নিয়ে বিবাহ পড়িয়েছিলেন। হযরত শায়খ (র) এ দুর্লভ সৌভাগ্যের জন্য আজীবন গৌরবান্বিত ছিলেন। তার এ সংসারের এক ছেলে ও চার মেয়ে। দ্বিতীয় আম্মা বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাটস্থিত উদয়পুর গ্রামের পীর বাড়ীর প্রখ্যাত আলেম ও বুযুর্গ হযরত মাওলানা আজিজুর রহমান (র.) এর কনিষ্ঠ কন্যা। মুদ্দাকথা এই আম্মাও অত্যন্ত শরীফ খান্দান ও পীর বংশের মহিলা।

উভয় আম্মারই দীনদারী, পরহেযগারী ও মেহমাননাওয়াযীর কথা হযরত শাইখুল হাদীছ সাহেবের সকল আত্মীয়-স্বজনদের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। দুই আম্মার বিষয়ে হযরত শায়খের ক্ষেত্রে যে জিনিসটি সর্বাধিক উলেখযোগ্য তা হচ্ছে দু সংসারের ভাইবোনদের মধ্যে কোন পার্থক্য করার উপায় নেই। এর সবই যেন এক মায়েরই গর্ভজাত সন্তান। দু সংসারের পুত্র-কন্যা হিসাবে না ছিল শায়খের নিকট কোন পার্থক্য, না রয়েছে বর্তমান ছোট আম্মার কাছে কোন তারতম্য। বড় আম্মার একমাত্র ছেলেকে ছোট আম্মার ছেলেমেয়েরা বড় ভাই হিসাবে যে মান্যতা ও শ্রদ্ধা করে তা যারা দেখে ও শোনে তারাই বলতে পারে। অন্যদিকে বড় আম্মার ছেলে ও মেয়েরা ছোট আম্মার ছেলে মেয়েদের এক মায়েরই গর্ভজাত ছোট ভাইবোন হিসাবে স্নেহবন্ধনে রেখেছেন। বড় আম্মার মেয়েদের জামাতারা ছোট আম্মাকে আপন শাশুড়ী ভিন্ন অন্য কিছু ভাবতেই পারেন না। কারণ, জামাতাদের প্রতি তার ব্যবহার ও আতিথেয়তা আপন গর্ভজাত মেয়েদের জামাতাদের মতই। শুধু শরঈ পর্দার কারণে আম্মা তাদের সামনে আসেন না। মোটকথা, দু সংসারের ছেলেমেয়েদের এ রকম সমতা ও ভারসাম্য এবং দু পক্ষের ভাইবোনদের মধ্যে এরূপ একাত্মতা বর্তমান কালে নিঃসন্দেহে বিরল। এটি সম্ভব হতে পেরেছে হযরত শায়খেরই এলমী গভীরতা ও সংসারী দূরদর্শিতার কারণে।

হযরত শায়খের ছেলেমেয়ে সকলে এমন কি নাতী-নাতনীরা পর্যন্ত তার মেধা ও প্রতিভার পরশে ধন্য হচ্ছেন। তার ছেলে আওলাদগণ নিঃসন্দেহে তার এলমী উত্তরাধিকার হচ্ছেন। যারা আলেম হয়ে বের হচ্ছেন তারা প্রায় সকলেই নীচের কিতাব থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীছের কিতাবাদি পড়াতে পারছেন। শায়খের সন্তান সন্ততির মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত  এ নেআমত কারো কারো নিকট প্রথম থেকেই এক ঈর্ষণীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

হযরত শাইখুল হাদীছ (র.) এর পারিবারিক জীবনের সবিশেষ উল্লেখযোগ্য দিকটি শুধু অভিনব ও বিস্ময়করই নয়, বরং এ একটি নতুন ইতিহাস। এ ইতিহাস জেনে এবং এর যথাযথ অনুসরণ করে বিশেষভাবে তার ছাত্ররা এবং সাধারণভাবে অন্যান্য দীনদার মহল ইহকাল ও পরকালের সফলতার দিকনিদের্শনা পেতে পারেন। সংক্ষেপে তার পরিবারের ইতিহাস এই যে, তার ছেলে মেয়ে এবং তাদের উভয় দিকের নাতি নাতনী ও নাতী পুতির মোট সংখ্যা প্রায় একশ জনেরও বেশি। এবং তার নিজের ২ সংসার এবং ছেলে ও নাতিদের বউ এবং মেয়েদের ও নাতনীদের জামাতা সহ সর্বমোট সংখ্যা ১৪০ এর মত। তিনি প্রথম ২ মেয়েকে আরবী, উর্দু ও বাংলা শিক্ষা দেন। অতঃপর তৃতীয় মেয়েকে পরীক্ষা মূলকভাবে হেফজ পড়তে দেন। দেখা গেল মেয়েটি ছেলেদের চেয়েও দ্রুতগতিতে কালামে পাকের হেফজ সমাপ্ত করে এবং সফলভাবে হেফজ রক্ষা করতে থাকে। এরপর থেকেই তিনি তার ছেলে হোক, মেয়ে হোক সকলকে হেফজে দেন এবং তা সমাপ্ত করার পর ছেলেদেরকে মাদ্রাসায় কিতাবী লাইনে আলেম বানাতে এবং মেয়েদের উর্দু ও বাংলার মাধ্যমে দীনী শিক্ষা দিতে থাকেন। আর পবিত্র রমজান মাসের আগমনে তার ঘরে ঘরে মেয়েদের খতমে তারাবীহ হয় এবং বড় ছেলেরা মসজিদে বা ঘরে জামাত করে তারাবীহ পড়ায়। আর মেয়ে ও নাতনীদের কেউ বাড়ীতে কেউ শ্বশুরালয়ে আলাদাভাবে খতমে তারাবীহ পড়ে। সে এক আজীব ও হৃদয়গ্রাহী দৃশ্য।

মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে শায়খের দৃষ্টিভঙ্গি এই যে, একটি মেয়ে হাফেজা হলে তাকে হেফজ রক্ষার জন্য সারা জীবন প্রয়োজন পরিমাণ পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে এবং সেই সাথে বাংলা বা উর্দু ভাষায় দীনী জরুরী এলম শিখে আমল করতে হবে। তার জন্য এ-ই বহু বড় দৌলত। তদুপরি সে যদি নিতান্তই কিতাবী লাইনে মাদ্রাসায় পড়ে তবে তার জন্য সর্বশেষ অর্জন এই হওয়া উচিত যে, সে যেন পবিত্র কুরআনের তরজমা সহীহ শুদ্ধভাবে করতে পারে এবং মেশকাত শরিফ সহীহ করে পড়ে বুঝতে পারে। উস্তাদদেরও এর প্রতি নজর দেওয়ার দরকার। বরকত স্বরূপ তাফসীরের কিতাব ‘জালালাইন’ ও হাদীসের কিতাব বোখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফ তাদের পড়ানো যেতে পারে। তবে শর্ত এই যে, মেয়েরা বোর্ডিং-এ থাকবে না, বরং পিতা-মাতার নজরে নিজ বাড়ীতে থাকবে। কেননা, দশ বাড়ীর দশ মেয়ে একত্রে থাকলেই আজে বাজে গল্প-গুজব করা, নাটক-উপন্যাস পড়া ও বাজে কাজের সুযোগ পায়।  প্রসঙ্গত এ দেশের শীর্ষস্থানীয় উলমায়ে কেরাম ও বেফাক বোর্ডের কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করি, তারা যেন প্রজ্ঞাবান এ মনীষীর চিন্তার আলোকে মেয়েদের জন্য একটি বাস্তবধর্মী নেসাব তৈরী করেন।

মাশাআল্লাহ, বর্তমানে শায়খের আওলাদদের মধ্যে হাফেজ ও হাফেজার সংখ্যা ৭৫ জনের মত। আধা হাফেজ ও হেফজের সবকে রয়েছে বেশ কয়েকজন শিশু। অর্থাৎ তিনি তাঁর সন্তান সন্তুতির সকলকে হাফেজ বা হাফেজা বানাতে প্রত্যেকের পিতামাতাকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে গেছেন। ফলে তার আওলাদদের মধ্যে ছেলেদের তো কথাই নেই, মেয়েদের বা নাতনীদের সংসারে অর্থাৎ স্বামীদের বাড়ীতেও তাদের সন্তানদের হাফেজ হাফেজা ও আলেম হওয়ার পথ তৈরী হয়ে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ। হযরত শায়খের ছেলেমেয়ে উভয়ের যে কারও ঘরের একটি মেয়েকে বিয়ে করে নিতে পারার অর্থ এই যে তার গর্ভে যে সন্তানই জন্ম নিবে, তাকে প্রথমে আল্লাহ চাহেন তো হাফেজ বা হাফেজা বানাতে হবে। তাই দেখা যায়, বরং জানা গেছে যে, শায়খের আওলাদদের মধ্যকার মেয়েকে যিনি বিয়ে করেন তিনি বস্ত্ততই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গেলেন, তার ভবিষ্যত সন্তানকে স্কুলে না দিয়ে হেফজ ও দীনী লাইনে পড়াবেন।

হযরত শায়খের জীবদ্দশায় তাঁর অন্যতম ওসিয়ত এই যে, ‘আমার বর্তমান আওলাদদের যে কারও ঘরে ভবিষ্যতে ছেলে পয়দা হোক বা মেয়ে, তাকে অবশ্যই হাফেজ বা হাফেজা বানাবে। তারপর ছেলেকে আলেম বানাবে ও মেয়েকে দীনী কিতাবাদি পড়াবে, সম্ভব হলে আরবী শিক্ষা দিয়ে আলেমা বানাবে। কিন্তু কখনও কাউকে স্কুল-কলেজে পড়াবে না।’ কারণ, একে তো বর্তমান কালে স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি পড়িয়ে ছেলেমেয়ের ঈমান-আকীদা ও আমলাদি ঠিক রাখাই মুশকিল। দ্বিতীয়ত পবিত্র কুরআন-হাদীছ ওহীর এলেম হিসাবে  এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না।

প্রসঙ্গত উলেখ্য যে, প্রতি বছর দু’এক বার হযরত শায়েখ তার আওলাদদের নিয়ে বসতেন এবং এ ওসিয়ত নবায়ন করতেন। বিশেষত প্রতি রমজান মাসে তার আওলাদদের ঘরে ঘরে খতমে তারাবীহ শেষে ২৯ শে রমযানের রাতে তাকে কেন্দ্র করে আমরা সকলে একত্রিত হতাম। উল্লেখ্য যে, পবিত্র রমযানে তার মেয়ে আওলাদরা তারাবীর নামাযে সাধারণত দু খতম এমন কি কেউ কেউ তিন খতমও করে থাকেন। এর জন্য পড়তে হয় কত খতম তা সহজেই অনুমেয়। তার আওলাদদের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, রমযানের শেষ দশকের রাতগুলি তারা তেলাওয়াত, সালাতুত তাসবীহ, তাহাজ্জুদ, যিকির-আযকারসহ খতমের পর খতম পড়ে  রাত জাগরণ করে থাকে। এভাবে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ শে সারা রাত তারা ছোট বড়  ছেলেমেয়ে সকলেই ইবাদত বন্দেগী করে কাটান, যাতে আলাহ তা‘আলার রহমতে শবে কদর পাওয়ার সৌভাগ্য সকলেরই হাসিল হয়। সে রাতগুলিতে তাদের শিশুরা পর্যন্ত আনন্দ খুশিতে পিতা-মাতা ও বড় ভাইবোনদের সঙ্গে সজাগ থাকে। আনন্দের আতিশয্যে তার ছোট ছোট নাতী-নাতনীর মধ্যে কেউ বলত, আজকে রাতে আমরা দাদার, কেউ বলত, নানার, কেউ বলত, বড় আববার ওয়াজ শুনব, দোয়া করব ও মিষ্টি খাব।

এমনি করে দেখতে দেখতে ২৯ শে রাত এসে যেত এবং সেই আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। পুরুষ ও ছেলেরা যথারীতি এশার নামায মসজিদে জামাতে আদায় করে বাসায় এসে যেত এবং হযরত শায়েখকে নিয়ে তারাবীর নামাযে দাঁড়িয়ে যেত। মাইকের ব্যবস্থা থাকত এবং ডান ও বাম দিকের ঘরগুলিতে শ্রদ্বেয়া আম্মা তার মেয়েদের ও নাতনী-পুতনীদেরসহ তারাবীর জামাতে শরীক হতেন। পারিবারিক খতমের এই শেষ রাতে হযরত শায়েখের ছেলে ও নাতীদের মধ্য থেকে কয়েকজন দুই দুই রাকাত করে (ইমামতিতে) পড়ত। আর তিনি শুনতে থাকতেন, কে কেমন পড়ে এবং সালামের পরই তেলাওয়াত ও নামাযের ধরণ সম্পর্কে শফকতপূর্ণ নসীহত করতেন। সেই সঙ্গে মেয়ে ও নাতনীদের খবর নেন, কে কত খতম পড়েছে পবিত্র রমযানে। মহিলাদের মধ্যে যারা হাফেজা নন, তাদেরও কেউ কেউ রমযান মাসে দশ দশ খতম করেছে শোনা গেছে। নামায বাদ তাকে মধ্যবর্তী এমন একটি স্থানে বসানো হত, যেখানে তাকে পুরুষ ও মহিলারা সকলেই দেখতে পেতেন। বলাই বাহুল্য, শুধু তারই পরিবাভুক্ত সদস্যদের নিয়েই এই সমাবেশ হত বলে তিনি সবারই মাহরাম ছিলেন তিনি। অবশ্য আওলাদদের মধ্যে মাহরাম ও গাইরে মাহরামের ব্যাপার থাকত বলে তাদের বসার স্থান পূর্ব থেকেই এরূপ করা হত যেন কোন ক্রমেই গাইরে মাহরামদের কেউ কাউকে দেখতে না পায়। মোট কথা, দোয়ার এ অনুষ্ঠানে ব্যবস্থাপনাটিই এরূপ ছিল যে, সবার জন্য এ এক শিক্ষনীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর পর শায়খুল হাদীস সাহেব (র.) সংপ্তি বয়ান করতেন,। তার পূর্বোক্ত ওসিয়তের নবায়ন করতেন এবং তার পারিবারিক এ দৌলতকে ধরে রাখার জন্য নসীহত করতেন।

সর্বোপরি আল্লাহ তা‘আলা যে এক মাত্র তাঁরই অনুগ্রহ ও রহমতে এ বিরল নেআমত তাদের দান করেছেন, এ জন্য সর্বদা তার শুকরিয়া আদায়ের জন্য এবং নিজেদের কোন ত্রুটি অর্থাৎ বড়াই, অহমিকা বা আত্মখুশির কারণে এ নেআমত ছিনিয়ে নেয়া না হয় সে জন্য তাঁর প্রতি নিবেদিত প্রাণ হয়ে থাকা ও আজীবন সেজদাবনত হয়ে থাকার জন্য উপদেশ দান করতেন। এ সময় হযরত শায়েখ (র.) ক্রমান্বয়ে ভাবাবেগে অশ্রুসিক্ত হয়ে যেতেন। সঙ্গে সঙ্গে তার আওলাদদেরও এরূপ অবস্থা দেখা যেত। তারপর রাহমানুর রাহীমের হুজুরে মুনাজাতের জন্য হাত উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে আওলাদদের সকলেই রোনা-যারী শুরু করে দিত। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। হযরত শায়খের উল্লেখযোগ্য ও হৃদয়স্পর্শী দু’আর ধরণখাণি সংক্ষেপে এরূপ হত : আয় আল্লাহ! তুমি রহমান, তুমি রাহীম। তুমি তেমারই কৃপা ও অনুগ্রহে এই নেয়ামত [অর্থাৎ দীনদারী ও কালামে পাকের হেফজ ও দীনী এলম হাসিলের সৌভাগ্য] আমাদের দান করেছ। এতে আমাদের কোনই কৃতিত্ব নেই। বরং আমাদের ধারণা চিন্তার বাইরে তুমি নিজ পক্ষ থেকে তোমারই খাস রহমতে যেমন ফলেফুলে সজ্জিত এ বাগান দান করেছ তেমনি এর হেফাজতের জন্যও আমরা তোমারই দয়া ও রহমতের মুখাপেক্ষী। আয় আল্লাহ! তুমি তোমার নিজ রহমতে ও তোমার হাবীবের তেফায়েলে আমাদের এ নেয়ামত কেয়ামত কাল পর্যন্ত দায়েম ও কায়েম রাখ।’ এ সময় হযরতে শায়েখ ও তার আওলাদদের হৃদয়স্পর্শী কান্না ও রোনাযারীতে ঘরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠত।

উল্লেখ্য যে, তাঁর উক্ত হেফ্জ বাগানের ফল ওফাতের পর থেকেই তিনি ভোগ করতে শুরু করেছেন। তাঁর ছওয়াব রেসানীর জন্য তাঁর হাফেজ আওলাদদের মধ্য থেকে দৈনিক এক খতম ও মেয়েদের পক্ষ থেকে এক খতম মোট দু‘খতমের ছওয়াব তাঁর রূহের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর দরবারে পেশ করা হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ এই সিলসিলা চলতে থাকবে এবং পরবর্তী আওলাদদের মধ্যে হাফেজ হাফেজার সংখ্যা বাড়তে থাকলে শায়খ (র)-এর ছওয়াবের ভাগও বাড়তে থাকবে। আল্লাহ তা‘লা কবুল করুন।

ওফাতের পূর্বে অশীতিপর বৃদ্ধ হয়েও ভোর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে আর শয়ন করতেন না। বাদ ফজর থেকে জোহর পর্যন্ত একাধারে ৪/৫ টি মাদ্রাসায় বোখারী শরীফের সবক পড়াতেন। আমরা ভেবে বিস্ময়াভিভূত হতাম, কোথা থেকে তিনি এ শক্তি ও কর্মতৎপরতা পাচ্ছেন! কিন্তু যখন গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন বুঝি তাঁর উপরোল্লিখিত উস্তাদদের সুদৃষ্টি ও দো‘য়ার বরকতে আলাহ তা‘আলা বোখারী শরীফের খেদমতকে তাঁর এ বান্দাকে দিয়ে বাংলার বুকে সুবিস্তৃত করে দেওয়ার জন্য রূহানী শক্তির সঙ্গে জিসমানী বা দৈহিক শক্তিও দিচ্ছেন। আয় আলাহ! তোমার হাবীবের হাদীছে পাকের এই খাদেমের স্থান জান্নাতুল ফেরদাউসে করে দিন। আমীন।

হযরত শায়খুল হাদীছ (র) তাঁর আওলাদদের প্রতিটি সদস্যের দীনী উন্নতির উদ্দেশ্যে একটি বিরল ও অপূর্ব ঐতিহ্য রেখে গেছেন। তা হচ্ছে, তাঁর আওলাদদের প্রত্যেক পরিবার থেকে পুরুষ সদস্যরা মাসে একবার রাতে শায়খের বাড়ীতেই মিলিত হয় এবং তারা সকলে প্রথমত নিজেদের আত্ম সমালোচনা এবং দ্বিতীয়ত তাদের সংশ্লিষ্ট পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের আলোচনা করে থাকে। তারা সার্বিক দীনী দিকগুলির আলোচনা করে নির্ধারণ করে, কার মধ্যে কতখানি দীনী উন্নতি হওয়া প্রয়োজন এবং এ পর্যন্ত  তার কতটুকু হয়েছে এবং আর কতখানি হওয়া দরকার। সে মতো আম্মাজানসহ সকল সদস্য তাদের ছোটদের উল্লিখিত যার যার রিপোর্ট জানিয়ে দেয়। এবং পরবর্তী মাসব্যাপি দেখা হয়, তার মধ্যে কতটুকু উন্নতি হচ্ছে। পরবর্তী মাসের মাহফিলে সে সব নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং তা আমলে আনার জন্য প্রত্যেককে নোটিশ দেওয়া হয়। তারা সম্মিলিতভাবে ঠিক করেন, সামনে সকল সদস্যের বাতেনী আখলাক সংশোধনে তারা সচেষ্ট হবেন। হযরত শায়খ (র)-এর রেখে যাওয়া এ ঐতিহ্যও অদূর ভবিষ্যতে ফুলে ফলে সুশোভিত হোক। সে জন্য সকল পাঠকের দো‘য়াও যেমন কাম্য, তাদের নিজেদের মধ্যেও এ ধরণের প্রচেষ্টা ও সাধনাও কাম্য।

আল্লাহ তা‘আলা কবুল করুন। তাঁর সকল খেদমতকে কিয়ামত পর্যন্ত বাকি রাখুন। আমীন।

http://www.alkawsar.com/article/754

Comments (0)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *