Main Menu

ছেলেকে নসিহত করলেন আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ.! আবু লাবিব মোহাম্মদ ইউনুস 

আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ.। জন্ম ৫৫১ হিজরিতে। একজন বিদগ্ধ আলেম। ইলম আমল আধ্যাতিকতায় ছিলেন অনন্য। প্রতি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করতেন। মসজিদ এবং ওয়াজের মসলিস ছাড়া ঘর থেকে বেরহতেন না। একজন ইতিহাসবেত্তা। ইতিহাসে যার ছিল গভীর জ্ঞান। একজন বিখ্যাত মুহাদ্দিস। শ্রোতা-নন্দিত যাদুময়ী মুগ্ধকরা ওয়ায়েজ ও বক্তা। যার বয়ান শোনে মুসলমান হয়ে ছিলেন দু-শয়েরও অধিক অমুসলিম। যার ছিলো ক্ষুরধার লিখনি শক্তি। তিনি জীবনের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে লিখেছেন। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় তিনশত। তিনি তার মেঝো ছেলে আবুল কাসেম বদরুদ্দীনকে উপদেশ দিতে রচনা করেছেন লাফাতাতুল কাবাদ ইলা নাসীহাতিল ওয়ালাদ নামে একটি স্বতন্ত্রগ্রন্থ। অনেক গুরুত্বপূর্ণ নসিহত করেছেন। বড়দের নসিহত বড়ই হয়। হতবাক করা এবং খুবই উপকারী। তার কিছু অনুবাদ পেশ করলাম পাঠকদের খেদমতে।

প্রিয় ছেলে,

জীবন খুব ছোট, কিন্তু কবরের মেয়াদ অনেক দীর্ঘ। সৎকর্মের ফলাফলই সেখানে পাওয়া যাবে। ঐ ব্যক্তি সেখানে সফল- যে প্রবৃত্তির ওপর বিজয় লাভ করবে। অপরদিকে ঐ ব্যক্তি চিরবঞ্চিত, যে দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। প্রকৃত স্বার্থকতা কী, জানো! সে হলো, ইলম ও আমলের মাঝে সমন্বয় সাধন করা। যে এই নিয়ামত লাভ করেছে দীন-দুনিয়ায় সে-ই চূড়ান্ত সফলকাম হয়েছে। কুরআন মাজিদ, আসহাবে রাসুলের জীবনাচার ও হক্কানী আলেমগণের পবিত্র জীবনী সব সময় সামনে রাখবে, এতে তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। অনেক কিছু আহরণ করতে পারবে।

প্রিয়!

তালিবে ইলমকে ইলম অর্জনের সময় সাহস ও ধের্য্যরে পরিচয় দিতে হয়। এ ব্যাপারে আমার জীবনে আছে অনেক ঘটনা। এসো তোমাকেও একটু শোনাই। আমাকে যখন মাদরাসায় ভর্তি করা হয় তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। সহপাঠিরা ছিল বয়সে আমার চেয়ে বড় বড়। আমি তাদের সাথে খেলায় অংশ নিতাম না। অহেতুক গাল-গল্পেও সময় নষ্ট করতাম না। কখনো নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা করতাম না। শিক্ষক মহোদয়ের কাছ থেকে যা শুনতাম তা ভালো করে মুখাস্থ করে নিতাম। প্রতিটি শাস্ত্র ভালোভাবে আয়ত্ব করে নিতাম। মুরুব্বি ও শায়খদের মজলিসে দ্রুত অংশগ্রহণে সচেষ্ট থাকতাম। কি যে ছোটাছুটি করতে হতো আমাকে! সকাল সন্ধা। একবার এ শায়েখের কাছে। আরেকবার ঐ শায়েখের কাছে। এভাবেই কাটত আমার ব্যস্ত সময়। কখনো কখনো খাবারের কথা বেমালুম ভুলে যেতাম। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার অসীম শুকরিয়াÑ তিনি আমাকে মাখলুকের দয়া ও ইহসান থেকে রক্ষা করেছেন।

কলিজার টুকরো ছেলে আমার!

আমি অহংকার করে বলছি না, আল্লাহ তায়ালার প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতা নিয়ে বলছি, আল্লাহ তায়ালা আমার কথায়া এমন প্রভাব দান করেছেন যে, আনুমানিক ২০০ জন অমুসলিম আমার হাতে (উৎসাহ ও আগ্রহভরে ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। লক্ষাধিক লোক মাহফিলে আমার প্রতি আকৃষ্ট থাকে।

প্রিয় পুত্র আমার !

গাফলতের নিদ্রা থেকে জেগে উঠো ! মৃত্যু তো শিয়রে দাঁড়িয়ে আছে। যে মুহূর্তগুলো অনর্থক কেটে গেছে. সেগুলোর ব্যাপারে লজ্জিত হও। নব উদ্যমে আমলে মনযোগী হও। অসৎ লোকের সঙ্গ এড়িয়ে চলবে। কিতাবই হচ্ছে তোমার সবচে ভালো বন্ধু। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো শাস্ত্রে বুৎপত্তি ও মাহারত অর্জিত না হবে, ততক্ষন সামনে এগুবে না। যেসব লোক ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে উঁচু স্তরে পৌঁছেছেন, তাঁদের জীবন কথা জানবে। তাঁদের মতো হতে চেষ্টা করবে। বরং আরো বেশি সামনে বাড়ার স্বপ্ন দেখবে। খুব ভালো করে জেনে রেখো, ইলম এমন বস্তু , যার দ্বার ঐ সকল লোকও অনেক বড় হয়ে যায়, যে পূর্বে কিছুই ছিল না।

প্রাণাধিক প্রিয় ছেলে আমার !

দুনিয়া অর্জনের জন্য কখনো কারো সামনে হাত বাড়াবে না। যে ব্যক্তি অল্পেতুষ্টি অবলম্বন করে সে সম্মানপ্রাপ্ত হয়। এক লোক বসরায় এসে জিজ্ঞেস করল, এই শহরের নেতা কে? কেউ একজন বলল: হাসান বসরি। আগুন্তুক এবার জিজ্ঞেস করল, কীভাবে সে নেতৃত্ব পেল? উত্তর এলো, হাসান বসরি মানুষের দুনিয়াবি বিষয়ের প্রতি মুখোপেক্ষি নন, কিন্তু মানুষ তার ইলমের মুখোপেক্ষী।

আমার পিতা ধনী ছিলেন। ভালো খেতেন ও পড়তেন। হাজার হাজার মুদ্রা আজ তিনি কবরের বাসিন্দা হলেন। আমি যুবক হলে আমার ঘর ও বিশ দীনার দিয়ে আমাকে বলা হল, এই হচ্ছে তোমার উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি। এগুলো পেয়ে দীনারগুলো দিয়ে আমি কিতাব কিনেছি। আর ঘর বিক্রি করে ইলম অর্জন করেছি। এখন আমার কাছে কিছুই নেই। আল্লাহর শোকর, এরপরো সবকাজ ঠিকঠাক মতো চলছে।

খুব ভালো করে স্মরণে রেখো, সব সময় নফসের হিসাব নেবে। নিজের ইলম দ্বারা তুমি যতটুকু উপকার ভোগ করবে, সেই অনুপাতেই শ্রোতারা তা থেকে উপকৃত হবে। বক্তা যদি নিজে আমল না করে , তাহলে তার ওয়াজের কোনো প্রভাব পড়বে না।

সূত্র : লাফাতাতুল কাবাদ ইলা নাসীহাতিল ওয়ালাদ

এ নসিহতে আছে আত্মার খোরাক। সফলতা ও উন্নতির পাথেয়। ছেলের প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটালেন কিতাব লিখে। তার ভবিষ্যত চিন্তা করে। জগতের সকল ছেলেদের উদ্দেশে। যাতে কেউ বিপথে না যায়। আমাদের উচিৎ এর থেকে পাথেয় নিয়ে জীবনকে আলোকিত করা। তাদের মতো হবার স্বপ্ন লালন করা হৃদয়ে হৃদয়ে। চেষ্টা-শ্রম ও দোয়া দিয়ে লক্ষপানে এগিয়ে চলা।

Comments

comments






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*

Facebook

Likebox Slider Pro for WordPress